নওরীন চলে যাওয়ার পর স্লাইডিং দরজাটা যখন হালকা একটা শব্দ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে গেল, তখন মনে হলো বাইরের পৃথিবীর সাথে আমার শেষ সুতোটুকুও ছিঁড়ে গেছে। ঘরের নিশ্ছিদ্র অন্ধকার আবার তার চেনা অহংকার নিয়ে আমাকে চারপাশ থেকে গিলে খেল। ও চলে যাওয়ার সময় যে চোখের জল ফেলে গেছে, তার কোনো অস্তিত্ব এই ৯৯.৪% আলো শোষণকারী Musou Black দেওয়ালে নেই। সেখানে কোনো দাগ পড়ে না, কোনো আলো প্রতিফলিত হয় না। কিন্তু আমার লজিক্যাল মস্তিষ্কের নিউরনগুলোতে একটা অদ্ভুত স্পাইক ফিল করছিলাম। একটা ইমোশনাল গ্লিচ, একটা আনওয়ান্টেড ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ। নওরীনের ওই কান্না, ওই শেষ কথাগুলো "একটা মানুষ বেঁচে আছে, অথচ তার ভেতরের মানুষটা মারা গেছে" আমার প্রসেসিং সিস্টেমে বারবার লুপের মতো ঘুরছিল।
এই ধরনের সিস্টেম গ্লিচ ফিক্স করার মেকানিজম আমার খুব ভালো করেই জানা আছে। আমি ড্রয়ারটা টেনে এক ঝটকায় খুলে ফেললাম। সিডেটিভের দুটো পুরো পাতা আর ৩ বোতল অ্যান্টিটাসিভ প্রায় অবলীলায় গিলে ফেললাম সবটুকু। তরলটার তেতো স্বাদ আমার গলা দিয়ে নেমে যাওয়ার সময় একটা চেনা অসাড়তা ছড়িয়ে দিতে লাগল। আমার বডি সিস্টেম এই ধরনের কেমিক্যাল ওভারডোজে অভ্যস্ত; এই ডোজে সাধারণ মানুষের কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হতে পারত, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে এটা কেবল রিয়েলিটির শার্পনেসটাকে একদম পারফেক্ট লেভেলে কমিয়ে এনে মস্তিষ্ককে শান্ত করবে।
মিনিট বিশেকের মধ্যে ওষুধের ককটেলটা কাজ শুরু করল। Smart watch-এ দেখাচ্ছে হার্টবিট স্লো হয়ে আসছে, বুকের ভেতরের ধকধকানিটা একটা চেনা ছন্দ খুঁজে পাচ্ছে। ডেল্টা ফোর্স গেমের স্ক্রিনটা খোলা ছিল, কিন্তু ওখানকার ভার্চুয়াল যুদ্ধ এখন আর আমাকে টানছে না। ওটা স্রেফ বাচ্চাদের খেলা। আমি আমার মূল মনিটরের দিকে তাকালাম। অন্ধকার ফ্রিল্যান্সিং দুনিয়ার আড়ালে আমার পোর্টফোলিওতে এখন যে প্রজেক্টটা চলছে, তার গভীরতা সাধারণ কোনো মানুষের কল্পনারও বাইরে।
তার আগে একটা ছোট কভার প্রজেক্টের কাজ বাকি ছিল। ক্লায়েন্টের সিস্টেমে বায়োমেট্রিক্স, নেটওয়ার্ক ইন্টিগ্রিটি আর ব্লকচেইন রেসপন্সিবিলিটি নিয়ে কিছু ক্রিটিক্যাল টেকনিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট শেষ করে ফাইলটা `project_final.zip` নামে সাবমিট করে দিলাম। পেমেন্ট কনফার্মেশনের গ্রিন সিগন্যাল ভেসে উঠল স্ক্রিনে। এটা ছিল আমার দুনিয়ার চোখের ধুলো দেওয়া।
আসল কাজ শুরু হলো ডার্ক ওয়েবের একটা বিশেষ মিলিটারি-গ্রেড এনক্রিপ্টেড টানেল ওপেন করার পর, কাজটা বেশ দীর্ঘ সময় ধরেই আমি করে আসছি। আসলে অনেক বড় project তো! সময়ের সাপেক্ষ ব্যাপার। তাছাড়া deadline নিয়ে একবার আমাকে বলা হয়েছিল। কিন্তু আমি তার কোন গুরুত্ব দেইনি। আমার কাজ হলো একটা flawless code তৈরি করা। Deadline নিয়ে ভাবার মতো সময় আমার নেই। আর যারা আমাকে এই প্রজেক্টটা দিয়েছিল, তারাও ভালো করেই জানে, এইরকম সিরিয়াস একটা প্রজেক্টে একটা ছোট্ট বাগ কি পরিমাণ ধ্বংসযোগ্য ঘটাতে পারে।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটা ডিরেক্টরি কোড: `Project H-CM09`। এটা কোনো সাধারণ হ্যাকিং বা ডেটা ব্রিচিং নয়। এটি একটি অত্যন্ত গোপনীয় 'হাইপারসনিক ক্রুজ মিসাইল' (Hypersonic Cruise Missile) প্রজেক্টের কোর নেভিগেশনাল এবং সাইবার ফায়ারওয়াল ফ্রেমওয়ার্কের কাজ। রাষ্ট্র বা ক্লায়েন্ট কে, সেটা আমি জানি না, জানার প্রয়োজনও মনে করি না। আমার কাজ শুধু লজিক আর কোড নিখুঁত করা।
সাধারণ ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলো রাডারে খুব সহজেই ধরা পড়ে যায় ওদের প্রেডিক্টেবল প্যারাবোলিক ট্র্যাজেক্টরির (প্যারাবোলা আকৃতির পথ) কারণে। কিন্তু এই হাইপারসনিক ক্রুজ মিসাইল প্রজেক্টটা সম্পূর্ণ আলাদা এবং মারাত্মক। এর ডিজাইনটাই করা হয়েছে আর্থ অবজেক্ট বা অ্যাটমোস্ফিয়ারের একদম নিচ দিয়ে, রাডার হরাইজনের সমান্তরালে ম্যাক ৫ (Mach 5) থেকে ম্যাক ৯ (Mach 9) স্পিডে উড়ে যাওয়ার জন্য। আমি স্ক্রিনে এর জটিল অ্যারোডাইনামিক ক্যাড (3D CAD) মডেল আর থ্রাস্ট ভেক্টর কন্ট্রোল সিস্টেমের কোডগুলো স্ক্রল করতে লাগলাম। এটিতে স্ক্র্যামজেট (Scramjet - Supersonic Combustion Ramjet) ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে। সাধারণ জেট ইঞ্জিনের মতো এতে কোনো মুভিং পার্টস বা কম্প্রেসার নেই, মিসাইলের প্রচণ্ড গতির কারণেই সামনের বাতাস প্রচণ্ড চাপে ইঞ্জিনে প্রবেশ করে এবং সুপারসনিক স্পিডেই ইগনিশন ঘটে।
এর নোজ কোনে (সামনের অংশ) ব্যবহার করা হয়েছে বিশেষ এক ধরণের আল্ট্রা-হাই-টেম্পারেচার সিরামিকস (UHTCs) এবং কার্বন-কার্বন কম্পোজিট মেটেরিয়াল, কারণ শব্দের চেয়ে ৭ গুণ গতিতে যখন এটি বাতাসের বুক চিরে উড়ে যাবে, তখন অ্যারোডাইনামিক হিটিংয়ের (Aerodynamic heating) কারণে এর তাপমাত্রা প্রায় ২২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাবে। সবচেয়ে বড় টেকনিক্যাল চমৎকারিত্ব হলো এর 'প্লাজমা স্টিলথ' (Plasma Stealth) প্রযুক্তি। এই এক্সট্রিম স্পিডের কারণে মিসাইলের চারপাশের বাতাস আয়নাইজড হয়ে একটা প্লাজমা শিল্ড তৈরি করে, যা যেকোনো এক্স-ব্যান্ড বা এস-ব্যান্ড রাডার তরঙ্গকে সম্পূর্ণ শুষে নেয়। ফলে পৃথিবীর কোনো আধুনিক আর্লি-ওয়ার্নিং রাডার সিস্টেমও এর সিগনেচার ট্রেস করতে পারবে না। তদুপরি, এর লঞ্চিং মেকানিজম এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যে, এটি ঠিক কোথা থেকে ফায়ার করা হয়েছে, তা লঞ্চ প্যাডের স্থানাঙ্কের বাইরে ট্র্যাক করা অসম্ভব।
আমি এই প্রজেক্টের রিয়েল-টাইম অপারেটিং সিস্টেমের (RTOS) মাল্টি-থ্রেডেড গাইডেন্স লুপের সাইবার শিল্ড বানাচ্ছি, যাতে কোনো অ্যান্টি-মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমের জিপিএস স্পুফিং (GPS Spoofing) বা ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার (EW) জ্যামিং একে তার টার্গেট থেকে সরাতে না পারে।
কোড কম্পাইল করার সময় আমার হাত কিবোর্ডের ওপর থমকে গেল। সিডেটিভ আর অ্যান্টিটাসিভের কড়া ওভারডোজের কারণে আমার চোখের সামনের ফোকাসটা কাঁপছে, স্ক্রিনের থ্রিডি মডেল আর গাইডেন্স অ্যালগরিদমগুলো যেন শূন্যে ভাসতে শুরু করেছে। আমি একটা গভীর শ্বাস নিলাম। তারপর মাউসটা ঘুরিয়ে মেইনফ্রেমে কোডটা আপলোড করার ঠিক আগমুহূর্তে একটা ব্যাকআপ স্ক্রিপ্ট রান করালাম।
আমি শুধু কাজটা ডেলিভারি দিচ্ছি না। আমি এই হাইপারসনিক ক্রুজ মিসাইলের সম্পূর্ণ টেকনিক্যাল ডেটা, স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিনের ফুয়েল-ইনজেকশন ম্যাট্রিক্স, প্লাজমা স্টিলথের গাণিতিক সমীকরণ, ভেহিকলের থ্রিডি ব্লু-প্রিন্ট এবং এর কোর নেভিগেশনাল সোর্স কোড সবকিছু ক্লোন করছি। প্রতিটা বাইট কপি হয়ে আমার টেবিলের নিচে লুকানো একটা সম্পূর্ণ এয়ার-গ্যাপড (Air-gapped), হার্ডওয়্যার-এনক্রিপ্টেড ৪MD-SSD ড্রাইভের ভেতরে জমা হতে লাগল।
কেন আমি এই কাজটা করছি? আমি কি এটা ডার্ক ওয়েবের কোনো সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে বিক্রি করে বিলিয়ন ডলার কামাতে চাই? নাকি কোনো দেশের বিরুদ্ধে এটাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার সুপ্ত কোনো ইচ্ছা আমার আছে? কিংবা হয়তো এটি স্রেফ আমার এক ধরণের অবসেসিভ মানসিক বিকার, মারণাস্ত্রের নিখুঁত সৌন্দর্যকে নিজের সংগ্রহে রাখার আদিম এক আনন্দ? এর কোনো উত্তরই স্পষ্ট নয়। আমার নিজের চেতনার অবচেতনেও এই উদ্দেশ্যটা একটা ধোঁয়াশার চাদরে ঢাকা। আমি নিজেই জানি না আমি এই ডেটা দিয়ে কী করব, কিন্তু আমার হাত অবলীলায় ফাইলগুলো সংরক্ষণ করে রাখল।
হঠাৎ মনে হলো ঘরের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি কমে গেল। এসির ঠান্ডা নয়, এটা একটা মনস্তাত্ত্বিক ঠান্ডা। আমার পেছনে, Musou Black দেওয়ালে একটা ছায়া নড়ে উঠল। আমি ঘাড় না ঘুরিয়েই একটা গোল্ড লিফ ধরালাম। স্মোকিং ভেন্টটা চালু করতেই ধোঁয়াগুলো শূন্যে ভাসতে লাগল।
স্ক্রিনের রিফ্লেকশনে আমি ছায়াটার অবয়ব দেখতে পেলাম। এটা নওরীন। নওরীনের একটা মায়াবী কিন্তু অত্যন্ত বিষণ্ণ ছায়া। আমার নিজেরই ওভারডোজড মস্তিষ্ক ওর রূপ ধরে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
"আমাকে খুব জ্ঞান দিলে যে তুমি সমাজের আবর্জনা পরিষ্কার করো, ফ্রিল্যান্সিং করো," নওরীনের ছায়াটা কথা বলে উঠল। ওর কণ্ঠস্বরটা ঠিক আগের মতোই আর্দ্র, কিন্তু কেমন যেন অলৌকিক শোনাল।
আমি সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়লাম। "আমি জ্ঞান দেই না নওরীন। ডেটা ট্রান্সফার করি মাত্র।"
নওরীনের ছায়াটা একটা শীতল, ব্যঙ্গাত্মক হাসি হাসল। সে মনিটরের দিকে ইঙ্গিত করল, যেখানে তখনো লোকাল ড্রাইভে ডেটা ট্রান্সফারের প্রোগ্রেস বারটা দেখা যাচ্ছিল। "আর এখন এই স্ক্রিনে বসে কী করছ এনাম? তুমি এমন একটা হাইপারসনিক ক্রুজ মিসাইলের গাইডেন্স সিস্টেম হ্যাক-প্রুফ করছ, যা কোথা থেকে লঞ্চ হলো তা কেউ জানতেই পারবে না। কোনো রাডারে ধরা পড়ার আগেই যা লাখ লাখ মানুষকে চোখের পলকে বাষ্প করে দিতে পারে। কিন্তু তুমি তো শুধু কাজটা জমা দিয়ে টাকা নিয়ে নিতে পারতে...
তুমি এই প্রজেক্টের সমস্ত ডিজাইন, সমস্ত টেকনিক্যাল কোড নিজের কাছে রেখে দিচ্ছ কেন? কেন এই মারণাস্ত্রের প্রতিটা ব্লু-প্রিন্ট নিজের কাছে সংরক্ষণ করছ? তুমি কি আরও বড় কোনো ধ্বংসের পরিকল্পনা করছ, এনাম? নাকি তুমি নিজেই একটা আন্তর্জাতিক ধ্বংসের মেকানিজম হতে চাও?"
আমি সিগারেটের ছাইটা অ্যাসট্রেতে ঝেড়ে একদম নিস্পৃহ, ভাবলেশহীন চোখে ছায়াটার দিকে তাকালাম। সিডেটিভের প্রভাবে আমার হার্টবিট তখনো ৭১-এ ফিক্সড। কোনো অপরাধবোধ নেই, কোনো উত্তেজনা নেই।
"আমি কোনো জাস্টিফিকেশন দেব না নওরীন," আমি শান্ত গলায় বললাম। "স্ক্র্যামজেটের থার্মাল শিল্ডিং, রাডার ইভেশন কিংবা ম্যাক ৭ স্পিডের ম্যানুভারেবিলিটি এগুলো আমার কাছে স্রেফ কিছু গাণিতিক সমীকরণ, কিছু আলফা-নিউমেরিক কোড। আর এই ডেটা আমার কাছে কেন রাখছি...
হয়তো এর কোনো নির্দিষ্ট কারণ নেই। কিছু জিনিস স্রেফ নিজের কাছে রেখে দিতে হয়। এই মিসাইল কোথায় পড়বে, কার ওপর পড়বে, কিংবা এই ডেটা ভবিষ্যতে কী কাজে লাগবে দ্যাটস নট মাই হ্যাডেক। আমার কাজ লজিক্যাল কনক্লুশন ড্র করা, মরালিটি জাজ করা নয়।"
"তুমি নিজেকে রোবট ভাবো এনাম, কিন্তু তুমি আসলে একটা জীবন্ত মারণাস্ত্র," নওরীনের ছায়াটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে শুরু করল।
জানিনা," আমি বিড়বিড় করে বললাম। "বাট আই অ্যাম আ ফ্ললেস মেকানিজম।"
ছায়াটা পুরোপুরি মিলিয়ে গেল। আমার টেবিলের নিচে লুকানো সিকিউরড ড্রাইভে তখন একটা হালকা 'বিপ' শব্দ হলো *Data Transfer 100% Complete. Drive Air-gapped and Locked.* একই সাথে মেইনফ্রেমেও ফাইলটা আপলোড হয়ে গেল।
ওষুধের কড়া প্রভাবে আমার চোখের পাতা এবার সত্যিই ভারী হয়ে আসছে। আমি চেয়ারের পিঠে মাথা হেলান দিলাম। মনিটরের আলোটা ফিকে হয়ে আসছে। বাইরের পৃথিবীতে হয়তো এখন ভোর হচ্ছে, হয়তো লাখ লাখ মানুষ ঘুম থেকে উঠে তাদের নতুন একটা স্বাভাবিক দিন শুরু করবে। তারা কোনোদিন জানতেই পারবে না, এই অন্ধকার Musou Black ঘরে বসে একটা 'আবেগহীন' ফ্রিল্যান্সার সবেমাত্র তাদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যেতে সক্ষম এমন এক রাডার-ফাঁকি-দেওয়া, সাইবার-অ্যাটাক-প্রুফ মৃত্যুর ব্লু-প্রিন্ট নিখুঁত করে দিল, এবং তার সমস্ত চাবিকাঠি নিজের পকেটে পুরে রাখল। কেন রাখল? সেই রহস্যের উত্তর হয়তো এই অন্ধকার ঘরটাও কোনোদিন জানতে পারবে না।
সিস্টেম এখন স্লিপ মোডে। আমার এখন একটা শান্ত ঘুম দরকার। স্বপ্নহীন, নিশ্ছিদ্র একটা ঘুম।
ওষুধের
সেই নিশ্ছিদ্র, স্বপ্নহীন অন্ধকার থেকে যখন আমার চেতনা ধীরে ধীরে ফিরতে
শুরু করল, তখন প্রথম যে অনুভূতিটা হলো সেটা এক তীব্র অসাড়তা। আমার হাত-পা
ভারী হয়ে আছে, চোখের পাতা দুটো যেন কেউ আঠা দিয়ে আটকে দিয়েছে। কানের
ভেতর একটা একটানা হাই-ফ্রিকোয়েন্সি 'বাজিং' নয়েজ।
কতক্ষণ ঘুমিয়েছি আমি? ১২ ঘণ্টা? ২৪ ঘণ্টা? নাকি তার চেয়েও বেশি?
সিডেটিভ আর তিন বোতল অ্যান্টিটাসিভের কড়া কেমিক্যাল ওভারডোজ আমার সিস্টেমের মেটাবলিজমকে কতটা স্লো করে দিয়েছিল, তা আমার অবশ শরীরটাই জানান দিচ্ছে। আমি জোর করে চোখের পাতা খোলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু চোখের সামনে সবকিছু কেমন যেন ঝাপসা, কাঁপছে। Musou Black দেওয়ালে ঘেরা অন্ধকার ঘরটার চেনা শীতলতা আমার চামড়ায় টের পাচ্ছি, কিন্তু সিলিংয়ের ওই তীক্ষ্ণ সাদা আলোটা এখন অদ্ভুত দেখাচ্ছে।
Smart watch-টা ভাইব্রেট করছে না, হয়তো সেটারও চার্জ শেষ হয়ে গেছে। আমি হাতটা তোলার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না। আমার পেশীগুলো এখনো আমার লজিক্যাল কমান্ড মানার মতো অবস্থায় আসেনি। ঠিক তখনই আমার অবশ কানের পর্দায় একটা খুব চেনা, অতি পরিচিত মৃদু শব্দের প্রতিধ্বনি হলো।
ক্লিক... জুউউশ... আমার রুমের বায়োমেট্রিক স্লাইডিং দরজাটা খুলে যাওয়ার শব্দ।
আমার মস্তিষ্ক ধীরগতিতে প্রসেস করার চেষ্টা করল এই ঘরে আমার অনুমতি ছাড়া বা আমার কোড ছাড়া কারও ঢোকার কথা নয়। তবে কি কোনো সিকিউরিটি ব্রিচ হলো? ডার্ক ওয়েবের সেই হাইপারসনিক মিসাইল প্রজেক্টের ব্যাকআপ ডেটা নিজের ড্রাইভে রাখার কারণে কোনো থ্রেট?
কিন্তু আমার ভাবনার লুপটা কেটে গেল একটা চেনা সুবাসে। ঘরের ভারী, বদ্ধ বাতাসে একটা খুব হালকা পারফিউমের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ল। লেভেন্ডার আর ভেজা মাটির একটা মিশ্রণ। এই সুবাসটা কোনো মারণাস্ত্রের ডেটা খোঁজা এজেন্টের হতে পারে না। এটা নওরীনের।
ভারী বুটের শব্দ নয়, খুব চেনা পায়ের নরম আওয়াজ আস্তে আস্তে আমার ওয়ার্কস্টেশনের দিকে এগিয়ে এল। আমার চোখের ফোকাসটা তখনো পুরোপুরি ঠিক হয়নি, ঘোলাটে অবয়বের মধ্য দিয়েই আমি দেখতে পেলাম একটা মানুষ আমার চেয়ারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। না, এটা দেড় দিন আগের সেই হ্যালুসিনেশন বা অবচেতন মনের তৈরি কোনো ছায়া নয়। এটি রক্ত-মাংসের নওরীন।
ও আমার দিকে কিছুক্ষণ নিস্পৃহ চোখে তাকিয়ে রইল। ওর পরনে সেই একই পোশাক শুধু উপরেই "apron" টা চড়ানো, চোখ দুটো ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। হয়তো গত দেড়টা দিন ও নিজেও এক মুহূর্তের জন্য শান্তিতে ঘুমাতে পারেনি।
নওরীন নিচু হয়ে আমার মুখের খুব কাছে ওর হাতটা নিয়ে এল। ওর আঙুলের স্পর্শটা আমার কপালে আর গালে লাগতেই আমার শরীরের ঠান্ডা রক্তে কেমন যেন একটা সূক্ষ্ম বিদ্যুত তরঙ্গ খেলে গেল। ওর হাতটা কাঁপছিল।
"তুমি আবার সেই কাজটাই করলে, তাই না এনাম?" নওরীনের কণ্ঠস্বরটা ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে আমার কানে এসে পৌঁছাল। কোনো চিৎকার নেই, কোনো রাগ নেই; কেবল এক অতলান্ত হাহাকার আর ক্লান্তি জড়ানো সেই সুর। "আমি জানতাম। আমি জানতাম আমি চলে যাওয়ার পর তুমি নিজেকে এভাবে শেষ করার চেষ্টা করবে। এই বিষাক্ত কেমিক্যালের বোতলগুলো... এই অন্ধকার... এগুলোই তোমার আসল জগৎ।"
আমি কথা বলার চেষ্টা করলাম। আমার ঠোঁট দুটো কাঁপল, কিন্তু গলা দিয়ে কেবল একটা অস্পষ্ট, শব্দ বের হলো, "নও...রীন.. তুমি এখন? কয়টা বাজে?"
"কথা বলো না, তোমার শরীর এখনো কাঁপছে," ও শান্ত গলায় বলল। ও টেবিলের ওপর পড়ে থাকা অ্যান্টিটাসিভের খালি বোতলগুলো আর সিডেটিভের ছেঁড়া পাতাগুলোর দিকে তাকাল।নওরীন টেবিলের ওপর থেকে অ্যান্টিটাসিভের খালি বোতলগুলো আর সিডেটিভের ছেঁড়া পাতাগুলো একপাশে সরিয়ে রাখল। ওর চোখে তীব্র উদ্বেগ, কিন্তু হাত দুটো কাঁপছে না। ও ভালো করেই জানে, এই মুহূর্তে কেবল সান্ত্বনার কথা দিয়ে আমার সিস্টেম সচল করা যাবে না; আমার শরীরের ভেতর যে মারাত্মক কেমিক্যাল টক্সিসিটি তৈরি হয়েছে, তার জন্য ইমিডিয়েট মেডিকেল ইন্টারভেনশন দরকার।
ও উঠে দাঁড়িয়ে আমার আলমারির পাশে রাখা ফার্স্ট-এইড বক্সটার দিকে গেল। আর বললো "আমি আসার পথে ফার্মেসি থেকে নরমাল স্যালাইন আর আইভি (IV) সেট নিয়ে এসেছি। জানতাম তোমার এই দশা হবে।"
ও দক্ষ হাতে স্যালাইনের ব্যাগটা আমার ওয়ার্কস্টেশনের ওপরের একটা মেটাল স্ট্যান্ডে ঝুলিয়ে দিল। তারপর ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ আর ক্যানুলা বের করল। নওরীন আমার অবশ ডান হাতটা টেনে নিল। ওর ঠাণ্ডা আঙুলগুলো আমার কবজির ওপর অ্যালকোহল প্যাড দিয়ে ঘষে চামড়াটা জীবাণুমুক্ত করল।
"একটু লাগবে, সহ্য করো," ও নিচু গলায় বলল।
আমি শুধু তাকিয়ে রইলাম। ওষুধের ঘোরে আমার ব্যথার অনুভূতিও তখন ভোঁতা। ও নিখুঁত নিশানায় ক্যানুলার সূঁচটা আমার ভেইনে (রক্তনালীতে) পুশ করল। হালকা একটা সুঁই ফোটার অনুভূতি হলো, ব্যস। ও প্লাস্টিকের টিউবটা স্যালাইনের ব্যাগের সাথে কানেক্ট করে দিতেই ঠাণ্ডা ফ্লুইড আমার তপ্ত, বিষাক্ত রক্তে মিশে যেতে শুরু করল। ও স্যালাইনের ড্রপ-রেটটা একটু বাড়িয়ে দিল যাতে বডির ডিহাইড্রেশন আর ড্রাগের কনসেনট্রেশন দ্রুত কমে আসে।
স্যালাইনের ফোঁটাগুলো টুপটুপ করে নামছে। নওরীন আবার এসে আমার পাশের টুলে বসল। ওর একটা হাত আমার কপালে রাখল, অন্য হাতটা দিয়ে আমার অবশ আঙুলগুলো চেপে ধরল। দেড় দিন ধরে চলা ওষুধের সেই কৃত্রিম অসাড়তা আর টক্সিসিটি নওরীনের দেওয়া স্যালাইনের ফ্লুইড আর ওর বাস্তব, উষ্ণ স্পর্শের কাছে ধীরে ধীরে হার মানতে শুরু করেছে। আমার লজিক্যাল নিউরনগুলো আবার সচল হচ্ছে, বাস্তবের শার্পনেসটা ফিরে আসছে।
নওরীন বললো "পুরো দেড়টা দিন পার হয়ে গেছে এনাম। তুমি এই অন্ধকার ঘরে একটা মরা মানুষের মতো পড়েছিলে। বাইরের দুনিয়ায় সূর্য উঠেছে, ডুবেছে, আবার উঠেছে... আর তুমি এখানে নিজের তৈরি করা কবরে বন্দি হয়ে ছিলে।"
ও আমার মনিটরের দিকে তাকাল। মেইন স্ক্রিনটা তখনো স্লিপ মোডে, কিন্তু সেকেন্ডারি মনিটরে আমার সেই এয়ার-গ্যাপড ৪MD-SSD ড্রাইভের এনক্রিপ্টেড লকিং সিগন্যালটা মৃদু ব্লিংক করছে। ও হয়তো জানে না ওই ড্রাইভের ভেতর কী লুকিয়ে আছে। ও হয়তো ভাবছে আমি স্রেফ কোনো সাধারণ কোডিংয়ের নেশায় নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছি।
নওরীন বললো "আমি ভেবেছিলাম আমি আর কোনোদিন এখানে আসবোনা,"
কিছুক্ষণ পর আবার নওরীন আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল, যে হাসিতে কেবল কষ্টই লুকিয়ে ছিল। তারপর বললো "কিন্তু না এসে পারলাম না। আমি জানতাম, আমি না এলে এই ঘরে তোমার ঘুম ভাঙানোর মতো আর কেউ নেই। তুমি তো নিজেকে রোবট ভাবো এনাম... কিন্তু একটা রোবটকেও সচল করার জন্য কারও না কারও ছোঁয়া লাগে।"
আমি কোনো উত্তর দিলাম না, আমি এখন অনুভব করতে পারছি যে আমি ধীরে ধীরে কিছটা সুস্থবোধ করছি। যদিও পুরো পুরি রিকভার করতে কিছুটা সময় লাগবে। কেবল ওর হাসপাতাল থেকে ইন্টার্ন ডিউটি শেষ করে ফেরা ক্লান্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার টেবিলের নিচে পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক হাইপারসনিক ক্রুজ মিসাইলের সম্পূর্ণ ডেটাবেস লক হয়ে আছে, যার চাবিকাঠি শুধু আমার কাছে। কিন্তু এই মুহূর্তে, দেড় দিন পর ওষুধের ঘোর কেটে যাওয়ার পর, আমার এই Musou Black ঘরের ৯৯.৪% অন্ধকার ভেদ করে নওরীনের এই উপস্থিতিটাই যেন আমার প্রসেসিং সিস্টেমে একমাত্র জীবন্ত ডেটা হিসেবে রেন্ডার হতে লাগল। কেন যেন একবার মনে হলো, এই মেয়েটাকে আমার খুব দরকার। তারপর আবার ভাবলাম, আমার কাউকে দরকার হবে কেন? ইদানিং, নিজেই নিজের ভাবনার মধ্যে মাঝেমধ্যে হারিয়ে যাচ্ছি।
ওই অসুস্থ অবস্থাতেই নওরিন এক হাতে আমার যে হাতটাতে সেলাইন লাগানো ছিল, সে হাতটা আলতো করে ধরলো। আর অন্য একটা হাত আমার মাথার এলোমেলো চুলগুলোর মধ্যে বিলি কেটে দিতে থাকলো এবং বলল,
"আচ্ছা এনাম, এটা কি কোন জীবন?"
আসলে, এই প্রশ্নটার উত্তর আমার কাছে নেই। আমি বরাবর এমন ছিলাম না। আজ থেকে পাঁচ বছর আগের এনাম আর আজকের এই এনাম, সম্পূর্ণ বিপরীত দুইটা মানুষ।
নওরীনকে একসময় কথায় কথায় আমি আমার পূর্বের জীবনের কথা কিছুটা শেয়ার করেছিলাম।
আপনাদের সাথেও শেয়ার করি। না হলে আপনারা ঠিক বুঝবেন না।
চলবে…

0 মন্তব্যসমূহ