ফ্রিল্যান্সার (পর্ব-৫)

 

আমি আমার সেই রুমে ফিরে আসলাম। পিসিটা টার্ন অন করতে দিয়ে সেই পুরাতন বদ অভ্যাস সিডেটিভ ও অ্যান্টিটাসিভ এর  এক্সট্রিম ওভারডোজ করলাম। এই লেভেলের ওভারডোজ করলে যেকোনো সাধারণ মানুষকে সাধারণত হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। কার্ডিয়াক অ্যারেস্টও হতে পারে। কিন্তু আমার সয়ে গেছে। এই ডোজেও বলতে গেলে, আমার এখন কিছুই হয় না। 

তো তারপর PC-র উপরের স্মোকিং ভেন্টটা চালু করে একটা Gold Leaf cigarette ধরিয়ে কম্পিউটারের সামনে বসলাম।

নওরিনের “তুমি খুব অদ্ভুত এনাম। কখনো তুমি যমদূত হয়ে আসো, আবার কখনো তুমি অবলা প্রাণীদের উদ্ধারকর্তা। তোমার এই বৈপরীত্য আমাকে মাঝেমধ্যে খুব বিভ্রান্ত করে।” এই কথাটা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। অনেকক্ষণ ধরে। আর এই ওভারডোজিংয়ের পরে আমি যেন চিন্তা গুলোকে দেখতে পাই। মস্তিষ্কের ভিতরে অনিয়মিতভাবে বিচ্ছুরিত ইলেকট্রোম্যাগনেটিক সিগন্যালগুলোকে আমি অনুভব করতে পারি। তাতে চিন্তাটা আরও গভীর থেকে গভীরতর হয়। সাউন্ড সিস্টেমে কম্পিউটার থেকে একটা গান চালু করে দিলাম।

আমি যখন এই পরিস্থিতিতে থাকি, তখন আমি মিউজিকের প্রত্যেকটা টিউনকে আলাদা আলাদাভাবে ধরতে পারি। এটা আমার একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। 

মোটামুটি মৃদু টিউনে গানটা বাজছে। আর আমি চিন্তা করছি, আসলে আমি কি?

আমি কি অসুর? নাকি আমি অবতার? নাকি আমি কিছুই না, Just একজন ফ্রিল্যান্সার? 

গানটার নাম মনে নেই, তবে বেস গিটার আর সিন্থেসাইজারের একটা অদ্ভুত মেলবন্ধন পুরো ঘরের ওই নিশ্ছিদ্র কালো অন্ধকারে যেন থ্রি-ডাইমেনশনাল আকার ধারণ করছে। আমি ধোঁয়াটা ছাড়লাম। স্মোকিং ভেন্ট সেটা শুষে নেওয়ার আগেই মনে হলো ধোঁয়ার কুণ্ডলীটা শূন্যে কিছুক্ষণ ভেসে রইল, যেন সময়ের গতিটা এই ঘরে এসে একদম থমকে গেছে। সিডেটিভ আর অ্যান্টিটাসিভের হেভি ডোজ আমার নার্ভাস সিস্টেমকে এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে গেছে যেখানে আমি এখন আমার হার্টবিটও গুনতে পারছি। ঢিপ... ঢিপ... ঢিপ। একদম নিখুঁত, মেকানিক্যাল একটা রিদম।

"অসুর নাকি অবতার?" শব্দদুটো আমার মাথায় প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।

অসুররা ধ্বংস করে, তাদের ভেতরে থাকে অন্ধ আক্রোশ। আর অবতাররা আসে রক্ষা করতে, তাদের থাকে মায়া। আমি তো ধ্বংসও করি না, রক্ষাও করি না। আমি শুধু ইকুয়েশন মেলাই। ডেল্টা ফোর্স গেমে যেমন একটা নির্দিষ্ট টার্গেট থাকে, আমার বাস্তব জীবনেও শুধু 'লজিক্যাল কনক্লুশন' থাকে। তাহলে নওরিন আমাকে নিয়ে এত কনফিউজড কেন?

কারণ ও একজন ডাক্তার। ওর কাজ বাঁচানো। ওর লজিকে মৃত্যু মানেই ব্যর্থতা। আর আমার লজিকটা হলো কেবলই সমস্যার সমাধান করা।  বাগ (bug) ফিক্স করার জন্য আমাকে strategy রচনা করতে হয় এবং আমার strategy কখনো ভুল হয় না। 

ওভারডোজের কারণে আমার চোখের সামনের ফোকাসটা মাঝে মাঝেই ব্লার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই ব্লার ভিশনের ভেতরেই আমি অন্য একটা ডাইমেনশন দেখতে পাই। আমার মনে হলো, আমার সামনের সেই Musou Black দেয়াল থেকে একটা অবয়ব বেরিয়ে আসছে। দেয়ালটা আলোর ৯৯.৪% অ্যাবজর্ব করে নেয় ঠিকই, কিন্তু হ্যালুসিনেশন তো আর আলোর রিফ্লেকশন নয়, আমি অবশ্য বিষয়টাকে হ্যালুসিনেশন বলতে নারাজ। এসব সাইকিয়াট্রিস্টদের মন ভোলানো কথা। আমি কোন পাগল নই যে সাইকিয়াট্রিস্টদের এসব মন ভোলানো কথা মাথায় ঢুকিয়ে বসে থাকবো। আমি কমান্ডো । আমি চিতা। যদিও এখন সেই বেশ আমি ছেড়ে দিয়েছি। 

আমার কাছে ওটা তো মস্তিষ্কের ভেতরের প্রোজেকশন। যেটা মস্তিষ্কের নিউরনের  মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত ও অনিয়মিত electromagnetic signal-এর ফলে তৈরি হয়েছে। 

আমি নড়লাম না। ভয়? মস্তিষ্কের প্রজেকশনকে ভয় পাওয়ার কী আছে? তবে। কৌতূহল আছে।

অবয়বটা স্পষ্ট হতে শুরু করল। এটা ইরা নয়, নাদিয়াও নয়। এটা আমি নিজে। হ্যাঁ, আমারই একটা প্রতিচ্ছবি, কিন্তু ওর চোখে কোনো শূন্যতা নেই। ওর চোখে একটা অদ্ভুত ক্ষোভ। ঠিক যেমনটা আমি আয়নায় দেখতাম এসএসজি (SSG) তে থাকার শেষ দিনগুলোতে।

"তুমি নিজেকে রোবট ভাবো, এনাম? তুমি কি চাও" প্রতিচ্ছবিটা কথা বলে উঠল। কণ্ঠস্বরটা ঠিক আমার মতো, কিন্তু তাতে ইমোশন মেশানো।

আমি সিগারেটে আরেকটা লম্বা টান দিয়ে ছাই ঝাড়লাম। "আমি নিজেকে কিছুই ভাবি না। আমি জাস্ট এক্সিস্ট করি।"

আমি আমারই অবয়বটাকে বললাম,

তুমি একটা বিষয় মাথায় রাখবে: তুমি মোটেই আমাকে "তুমি" করে বলবে না। আমি তোমার জুনিয়র কেউ নেই, যে তুমি আমাকে "তুমি" করে বলবে। 

তবে তোমাকে খুশি করার জন্য, এটুকু বলছি। 

"আমি লজিক্যাল ব্যালেন্স চাই," আমি শান্ত গলায় যুক্তি দিলাম। "সমাজের ইকোসিস্টেমে যখন আবর্জনা জমে যায়, তখন সেটাকে পরিষ্কার  করতে হয়।"

"তাহলে নাদিয়ার ওই বিড়াল দুটোকে কেন উদ্ধার করলে? ওটাও কি লজিক্যাল ব্যালেন্স? নাকি নওরিনের মুখে হাসি দেখার জন্য তোমার ভেতরের মরে যাওয়া মানুষটার একটা মরিয়া চেষ্টা?"

কথাটা তীরের মতো বিঁধল। সিডেটিভের ঘোরটা যেন এক মুহূর্তের জন্য কেটে গেল। আমি সোজাসুজি আমার ওই প্রোজেকশনের দিকে তাকালাম।

"নওরিন একটা ফ্যাক্টর মাত্র। ওর ইমোশন আছে, আমার নেই।"

"তুমি নিজেকে ঠকাচ্ছো, এনাম। তুমি একটা অন্ধকার ঘর বানিয়েছো আলো থেকে পালাবে বলে। তুমি এই কালো রঙের আড়ালে তোমার ভেতরের কষ্টগুলোকে লুকাতে চাও। তুমি আসলে কোনো ফ্রিল্যান্সার নও, তুমি একজন পলাতক সৈনিক। যে সিস্টেমের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে নিজেই নিজের একটা সিস্টেম বানিয়েছে।"

এবার আমি শান্ত গলায় তাকে বললাম, "এবার তুমি সীমা অনেক দূর ছাড়িয়ে গিয়েছ এবং তুমি আমার সিগারেট খাওয়ার সময় বিঘ্ন ঘটিয়েছো। Whatever you are I don't give a damn. Now just fuck off." 

আমি পিসির সাউন্ডটা আরেকটু বাড়িয়ে দিলাম। প্রতিচ্ছবিটা ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে গেল ওই মুসো ব্ল্যাকের অতল গহ্বরে।

আমি আবার একা। শুধু আমি, আমার গোল্ড লিফ, আর স্পিকার থেকে ভেসে আসা একটা  ইনস্ট্রুমেন্টাল।

আমি কি অসুর? আমি কি অবতার?

নাহ, আমি এর কোনোটিই নই। আমি হলাম এই পচে যাওয়া সমাজের একটা 'নেসেসারি ইভল' (Necessary Evil)। আমি সেই অন্ধকার, যা না থাকলে এরা আলোর মর্ম বুঝত না। আমি এনাম। জাস্ট একজন ফ্রিল্যান্সার। যার কাজ এখনো শেষ হয়নি।

হঠাৎ আমার টেবিলের ওপর রাখা সেকেন্ডারি ফোনটা সাইলেন্ট মোডে ভাইব্রেট করে উঠল। নীলচে স্ক্রিনের আলোয় অন্ধকার ঘরটা ক্ষণিকের জন্য চিরে গেল। আমি সিগারটটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে ফোনটা হাতে নিলাম। ডার্ক ওয়েবের ওই স্পেশাল এনক্রিপ্টেড প্রোটোকল থেকে একটা মেসেজ এসেছে। কোনো নাম্বার নেই, শুধু একটা টেক্সট।

"The cats are safe, but the alley is still full of rats."

আমার ঠোঁটের কোণে একটা শীতল হাসি ফুটে উঠল, অবশ্য, কিছুটা বিরক্তও হলাম। ইঁদুর...

সিস্টেমের বাগ এখনো রয়ে গেছে তাহলে। ডেল্টা ফোর্সের নেক্সট মিশনটা এবার বোধহয় আমাকে নিজেকেই ডিজাইন করতে হবে। আমি কি-বোর্ডের ওপর হাত রাখলাম। 

কি-বোর্ডের ওপর আঙুলগুলো চলতে শুরু করল। মেকানিক্যাল সুইচের ‘ক্লিক ক্লিক’ শব্দটা সাউন্ড সিস্টেমের মৃদু ইনস্ট্রুমেন্টাল মিউজিকের সাথে এক অদ্ভুত সিনক্রোনাইজেশন তৈরি করল। স্ক্রিনে ডার্ক ওয়েবের এনক্রিপ্টেড কোডগুলো একের পর এক খুলে যাচ্ছে। আমি ‘ইঁদুর’দের আইডেন্টিটি ট্রেস করছি। যারা ভেবেছে ঢাকার অলিগলিতে লুকিয়ে থেকে তারা পার পেয়ে যাবে, তারা চিতার শিকার করার পদ্ধতি সম্পর্কে জানে না। এসএসজি-র কঠোর ট্রেইনিং আমার রক্তে এমনভাবে মিশে আছে যে, এই অতিরিক্ত ড্রাগের ভেতরেও আমার লজিক্যাল থিংকিং এক চুলও নড়চড় হয় না।

ঠিক তখনই আমার ফ্ল্যাটের মেইন ডোরের স্মার্ট লকটা খোলার একটা মৃদু ‘বিপ’ শব্দ হলো।

আমার এই কড়া সিকিউরিটির ঘরে অনধিকার প্রবেশ প্রায় অসম্ভব। কিন্তু একজনের কাছে এই ইমার্জেন্সি বাইপাস কোডটা দেওয়া আছে। নওরিন। ও এসেছে।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমার ঘরের দরজার স্লাইডিং প্যানেলটা সরে গেল। করিডোরের হালকা আলো করিডোর থেকেই মিলিয়ে গেল, কারণ মুসো ব্ল্যাক দেয়াল সেই আলোকে ঘরে ঢুকতেই দিল না। নওরিন ঘরের ভেতরে এসে দাঁড়াল। সিলিংয়ের সেই ইন্টারোগেশন রুমের মতো সাদা আলোটা কেবল আমার টেবিল আর পিসির ওপর এসে পড়ছে, বাকি পুরো ঘর নিশ্ছিদ্র অন্ধকার।

ও কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। এই ঘরের অন্ধকার আর গুমোট আবহাওয়া ওকেও প্রতিবারই কিছুটা স্তব্ধ করে দেয়। তারপর ও এগিয়ে আসল। ওর পায়ের জুতোর শব্দটা সাউন্ডপ্রুফ দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ঘরের ভেতরেই মরে গেল।

টেবিলের ওপর রাখা অ্যাশট্রেতে জ্বলতে থাকা গোল্ড লিফের ধোঁয়া আর ঘরের ভেতরের অদ্ভুত গন্ধটা ওর খুব চেনা। ও একজন ডাক্তার, তাই গন্ধটা শুঁকেই ওর ভ্রু কুঁচকে গেল। ও সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকাল। ওভারডোজের কারণে আমার চোখের পিউপিল ডাইলেটেড হয়ে আছে, চোখের কোণগুলো সামান্য লাল।

"তুমি আবার ওভারডোজ করেছ, এনাম?" নওরিনের কণ্ঠে রাগ আর উদ্বেগের একটা তীব্র মিশ্রণ। ও ব্যাগটা টেবিলের একপাশে রেখে আমার ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল।

আমি কি-বোর্ড থেকে হাত না সরিয়েই একদম নিস্পৃহ, ভাবলেশহীন শান্ত গলায় বললাম, "ডাক্তারদের একটা বড় সমস্যা হলো, তারা সবকিছুকে প্রেসক্রিপশন আর মেডিকেল সায়েন্সের ফ্রেমে বাঁধতে চায়। আমি তোমাকে আগেই বলেছি নওরিন, সাধারণ মানুষের বডি মেকানিজম আর একজন এক্স-কমান্ডোর বডি মেকানিজম এক নয়। এটা ওভারডোজ নয়, এটা আমার সিস্টেমকে ওভারক্লক করার একটা মেথড মাত্র।"

"স্টপ ইট, এনাম!" নওরিন কিছুটা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। "কাকে বোকা বানাচ্ছো? সিডেটিভ আর অ্যান্টিটাসিভের এই কম্বিনেশন আর এই লেভেলের ডোজ যে কোনো মানুষকে কিডনি ফেইলিওর বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে নিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। তুমি নিজেকে কোনো রোবট বা প্যারাকমান্ডো ভাবলেই তোমার হার্টটা লোহার হয়ে যাবে না। ওটা এখনো রক্ত-মাংসেরই আছে।"

আমার মুখাবয়বে কোনো অভিব্যক্তি ফুটল না। চোখের পলকও কাঁপল না। আমি শান্তভাবে cigarette-টা হাতে নিলাম। শেষ টানটা দিয়ে সেটাকে অ্যাশট্রেতে পিষে নিভিয়ে দিলাম। কণ্ঠস্বরে কোনো ওঠানামা না এনে একদম সমান্তরাল, ফ্ল্যাট টোনে বললাম, "তাহলে ওটা নিয়ে তোমার এত মাথা ঘামানোর তো কোনো কারণ দেখছি না। আমি বাঁচলাম না মরলাম, তাতে কি সমাজের কোনো ইকুয়েশন বদলে যাবে? নওরিন, তুমি এত রাতে এখানে কেন এসেছ?" হয়তো কদিন পরেই তোমার বিয়ে হবে। তখন সমাজের এই কীটগুলোই এই ছোট ছোট বিষয়গুলোকে "issue" করে তুলবে। যেটা আমার মোটেই ভালো লাগবে না। নওরিন, তোমার তো এগুলো বোঝার কথা, তাই না? 

নওরিন আমার এই চরম শীতলতায় অভ্যস্ত, তাও ওর ফর্সা মুখটা ক্ষোভে কিছুটা থমথমে হয়ে গেল। ও বলল, "আমি বিড়াল দুটোর ব্যাপারে কথা বলতে এসেছি। আর শোনো, সমাজের লোক কি বললো, কি না বললো, সেটা নিয়ে আমার কোন কিছু যায় আসে না। এই ধরনের কথা ভবিষ্যতে যেন আমি তোমার কাছ থেকে আর না শুনি। আমি শুধু বললাম, "আচ্ছা, ঠিক আছে। আর শুনবে না।" 

নওরিন বলল, "হ্যাঁ, আচ্ছা, যেটা বলছিলাম।" খুলনা থেকে অতটা পথ জার্নি করে ওগুলোকে নিয়ে আসলে, আমার কাছে রেখে দিলে। অথচ নিজে একবারের জন্যও ওগুলোর দিকে ফিরে তাকালে না। ওগুলো এখন কিছু খাচ্ছে না, শুধু মিউমিউ করছে। তোমার ওই নাদিয়া... তার শেষ স্মৃতি এই দুটো অবলা প্রাণী। অথচ তোমার মধ্যে কোনো অনুভূতিই নেই?"

আমি ওর দিকে তাকালাম। আমার চোখে বা চেহারায় কোনো দুঃখ কিংবা ক্ষোভের লেশমাত্র ছিল না। একদম ভাবলেশহীন গলায় বললাম, "অনুভূতি দিয়ে বিড়াল বাঁচানো যায় না, নওরিন। নাদিয়া মারা গেছে, ওটা একটা কমপ্লিটলি ক্লোজড চ্যাপ্টার। ওর ফাইল আমি ওখানেই চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছি। আর বিড়াল দুটোকে ওখান থেকে উদ্ধার করাটা ছিল স্রেফ একটা লজিক্যাল কনক্লুশন। ওগুলো অবলা প্রাণী, তাই নিয়ে এসেছি। আর বিড়াল দুটো তোমার কাছে সেফ, কারণ তোমার লজিকে জীবন বাঁচানোই শেষ কথা। আই হ্যাভ ডান মাই জব।"

নওরিন আমার টেবিলের ওপর ঝুঁকে এল। ওর চোখ দুটো এবার আমার খুব কাছাকাছি। ও কিছুটা বিভ্রান্ত আর রহস্যময় গলায় বলল, “তুমি খুব অদ্ভুত এনাম। তুমি আসলে কে, এনাম? কোনো কোল্ড-ব্লাডেড রিভেঞ্জ-সিকার, নাকি কোনো ত্রাতা?”

আমি যেভাবে বসেছিলাম, ঠিক সেভাবেই স্থির রইলাম। নওরিনের চোখের দিকে সরাসরি তাকালাম, কিন্তু আমার চোখের দৃষ্টিতে কোনো চঞ্চলতা বা উত্তেজনা ছিল না। কণ্ঠস্বর আগের মতোই একদম নিস্পৃহ আর শান্ত রেখে বললাম, "নওরিন, তোমাকে একটা সতর্কবার্তা দিয়ে রাখি। আমার সাইকো-অ্যানালাইসিস করার চেষ্টা একদম করবে না। আমি সাইকিয়াট্রিস্টের মন ভোলানো গল্প শোনার মতো লোক নই। আমি কমান্ডো ছিলাম, দেশের জন্য লড়েছি। এখন আমি একজন ফ্রিল্যান্সার, নিজের সিস্টেমে লড়ি। সমাজের যে পোকাগুলো ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে, সেগুলোকে ডিলিট করার জন্য আমাকে স্ট্র্যাটেজি রচনা করতে হয়। আর আমাকে খেয়াল রাখতে হয় স্ট্র্যাটেজি যেন কখনো ভুল না হয়।"

আমি পিসির মনিটরের দিকে ইঙ্গিত করলাম, যেখানে ডার্ক ওয়েবের সেই মেসেজটা জ্বলজ্বল করছে।

"দেখো ওটার দিকে," আমি একদম শান্ত গলায় বললাম।

নওরিন মনিটরের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। টেক্সটটা পড়ল: "The cats are safe, but the alley is still full of rats."

ওর মুখটা ক্ষণিকের জন্য ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ও আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "এর মানে কী? তুমি আবার কার পেছনে লাগছ?"

"এর মানে হলো, কিছু একটা এখনো শেষ হয়নি বা নতুন কিছু শুরু হতে চলেছে," আমি কি-বোর্ডে আবার হাত রাখলাম, আমার কণ্ঠস্বর একই রকম নিস্তব্ধ। "শহরে আবর্জনার অভাব নেই। একটা বাগ ফিক্স হলে আরেকটা ক্র্যাশ করে।"

নওরিন আতঙ্কের সুরে বলল, "তুমি আবার কোনো বিপজ্জনক কিছু করতে যাচ্ছো, এনাম? তুমি ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে ওদের যতই ধ্বংস করার চেষ্টা করোনা কেন, বাস্তব জীবনে ওই লোকগুলোর ক্ষমতা অনেক। আমি একজন ডাক্তার হিসেবে তোমাকে অনুরোধ করছি..."

”নওরিন। আমি জাস্ট সিস্টেমে থাকা বাগ (bug) ফিক্স করি। তুমি এখন আসতে পারো। তোমার ডিউটি হসপিটালে, আর আমার ডিউটি এই অন্ধকারে।"

নওরিন কিছু সময় আমার দিকে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। আমার এই পাথরের মতো ভাবলেশহীন মুখের সামনে ওর কোনো লজিক বা আবেগ যে খাটবে না, ও হয়তো সেটা বুঝতে পারল। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওর ব্যাগটা তুলে নিল। দরজার দিকে এগিয়ে যাওয়ার আগে ও ঘুরে দাঁড়াল এবং দরজার দিকে পা বাড়াল। স্লাইডিং ডোরটা খোলার জন্য ও যখন হাত বাড়াতে যাবে, ঠিক তখন আমার ভেতরের মেকানিজমে কোথাও যেন একটা অদ্ভুত বিচ্যুতি ঘটল। কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড ক্যালকুলেশন ছাড়াই, সম্পূর্ণ অবচেতনভাবে আমি কি-বোর্ড থেকে হাতটা সরিয়ে নিলাম।

আমি ওর দিকে না তাকিয়েই, ঘরের সেই নিথর শান্ত আর ভাবলেশহীন গলায় বললাম, "দাঁড়াও, নওরিন, তোমার সাথে কিছু কথা বলি। অনেকদিন কারো সাথে কথা বলা হয় না।"

নওরিনের হাতটা দরজার সেন্সরের ঠিক ইঞ্চিখানেক ওপরে থমকে গেল। ও কয়েক সেকেন্ড ওভাবেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, যেন ও নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। যে এনামকে ও চেনে, তার মুখ থেকে এই ধরনের মানবিক আকুতি তা সে যতই ফ্ল্যাট টোনে বলা হোক না কেন তা একেবারে অসম্ভব।

ও আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়াল। ওর মুখে এক অবিশ্বাস্য বিস্ময়। ও ব্যাগটা হাত থেকে না ছেড়েই আবার আমার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল।

আমি মনিটর থেকে চোখ সরিয়ে ওর দিকে তাকালাম। ওভারডোজের কারণে আমার চোখের পাতা দুটো সামান্য ভারী, কিন্তু দৃষ্টি একদম স্থির। আমি শান্ত গলায় বললাম, "এই ঘরে ২৪ ঘণ্টা কোনো দিন কিংবা রাত নেই। শুধু কিছু ডিজিটের লুপ। মাঝে মাঝে মনিটরের এই কোডগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হয়, আমিও কোনো মেমোরি চিপের ভেতরে আটকে থাকা একটা প্রোগ্রাম মাত্র। মানুষের গলার টোন কেমন হয়, সেটা মাথা থেকে মুছে যেতে থাকে। তোমার আওয়াজটা শুনলে মনে হয়, এই মুসো ব্ল্যাকের বাইরেও একটা পৃথিবী এক্সিস্ট করে।"

আমার কণ্ঠস্বরে কোনো দুঃখ ছিল না, কোনো একাকীত্বের আর্তি ছিল না। আমি জাস্ট একটা বৈজ্ঞানিক সত্যের মতো করে কথাগুলো বলে গেলাম। কিন্তু নওরিন যেভাবে আমার দিকে তাকাল, তাতে বুঝলাম আমার এই ভাবলেশহীনতা ওর ভেতরে অন্যরকম একটা ঝড় তুলেছে।

নওরিন ওর ব্যাগটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল। ওর ঠোঁট দুটো সামান্য কাঁপছিল। ও নরম গলায় বলল, "তাহলে তুমি কেন নিজেকে এই খাঁচায় বন্দি করে রেখেছ, এনাম? কেন এই ড্রাগের ওভারডোজ করে নিজের মস্তিষ্কটাকে এভাবে অবশ করে দাও? তুমি তো চাইলে সাধারণ মানুষের মতো আলোতে বাঁচতে পারো।"

আমি একটা হালকা শ্বাস নিলাম, যার মধ্যে কোনো দীর্ঘশ্বাসের ক্লান্তি ছিল না। "আলো আমাকে বিভ্রান্ত করে, নওরিন। এসএসজি-তে থাকার সময় যখন প্রথম একটা মিশন সাকসেসফুল করি, তখন চারপাশের আলো অনেক উজ্জ্বল ছিল। মিডিয়া, মেডেল, মানুষের তালি সব আলোর নিচে ঝকমক করছিল। কিন্তু সেই আলোর ঠিক পেছনের অন্ধকারটা কত নোংরা, তা আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। ওই ঝকঝকে আলোর দুনিয়ায় মানুষ হাসিমুখে একে অপরের গলা কাটে। আর আমার এই অন্ধকারটা সৎ। এটা কোনো মিথ্যা লুকায় না, কোনো মুখোশ পরে না।"

নওরিন আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। ঘরের সেই সাদা শার্প আলোটা ওর মুখের ওপর পড়ায় আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম, ওর চোখের কোণগুলো আস্তে আস্তে ভিজে উঠছে। একজন ডাক্তার হিসেবে ও প্রতিদিন কত শত মানুষের কান্না দেখে, মৃত্যু দেখে; কিন্তু আমার এই জীবন্ত লাশের মতো স্থিরতা ওকেও ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছিল। ওর চোখ দিয়ে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে ওর গালে এসে পড়ল।

আমি ওর চোখের পানির দিকে তাকালাম। একবার মনে হলো, ওর চোখের পানিটা নিজ হাতে মুছে দিই কিন্তু আমার মুখাবয়বে কোনো পরিবর্তন হলো না। আমি একই রকম নিস্পৃহ গলায় বললাম, "তুমি কাঁদছো কেন, নওরিন? কান্নার পেছনে তো একটা লজিক্যাল ইমোশন থাকতে হয়। আমার এই কথায় কোনো ইমোশন নেই। আমি জাস্ট আমার রিয়্যালিটি স্টেটমেন্ট দিলাম।"

নওরিন ওর হাত দিয়ে গালের জলটা মুছে ফেলল, কিন্তু ওর চোখের সেই আর্দ্রতা কমল না। ও একটা ভাঙা গলায় ফিসফিস করে বলল, "আমি তোমার জন্য কাঁদছি না, এনাম। আমি কাঁদছি সায়েন্সের ব্যর্থতার জন্য। আমি একজন ডাক্তার হিসেবে মানুষের হার্টবিট সচল করি, মানুষকে বাঁচিয়ে তুলি। কিন্তু তোমার সামনে এসে আমার মনে হয়, একটা মানুষ বেঁচে আছে, তার সমস্ত অর্গান কাজ করছে, অথচ তার ভেতরের মানুষটা অনেক আগেই মারা গেছে। এই অনুভূতিটা খুব ভয়ানক, এনাম। তুমি নিজে একটা পাথর আর আরেকটা পাথরের দেয়াল তুলে রেখেছ তোমার চারপাশে, যার ওপাশে কেউ পৌঁছাতে পারে না।"

"পৌঁছানোর কোনো প্রয়োজনও নেই," আমি শান্তভাবে বললাম। "পাথরের কোনো অনুভূতি থাকে না, তাই তার কোনো কষ্টও নেই। আমি আমার এই স্টেট-এ বেশ ভালো আছি। অন্তত কোনো ইলিউশন আমাকে তাড়া করে না।"

নওরিন আর কোনো কথা খুঁজে পেল না। ও বুঝতে পারল, আমার এই শূন্যতাকে পূর্ণ করার মতো কোনো থেরাপি বা মেডিসিন ওর জানা নেই। ও ওর ব্যাগটা আবার হাতে নিল। এবার ওর বিদায় নেওয়ার মধ্যে কোনো রাগ ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা, আচ্ছা, তার মধ্যে কি "ভালোবাসা মেশানো" ছিল? ।

ও দরজার দিকে হেঁটে গেল। সেন্সরে হাত দিতেই স্লাইডিং দরজাটা খুলে গেল। ও করিডোরে পা দেওয়ার আগে একবার শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল, তারপর অন্ধকারের বুক চিরে বাইরের আলোয় হারিয়ে গেল। দরজাটা আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে গেল।

আমি আবার একা। আমার চারপাশের ৯৯.৪% আলো শোষণ করে নেওয়া মুসো ব্ল্যাক দেয়ালগুলো আগের মতোই নিস্তব্ধ। নওরিনের চোখের সেই জল বা ওর কথার আবেগ কোনো কিছুই এই ঘরের দেওয়ালে আঁচড় কাটতে পারল না। ও কখনোই জানতে পারবে না যে আমার 'বাগ ফিক্স' করার পদ্ধতিটা কেবল স্ক্রিনের কোডিং এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ওটা হয়তো অনেক বেশি রক্তক্ষয়ী, হয়তো অনেক বেশি বীভৎস ।

আমি আবার পিসির মনিটরের দিকে তাকালাম। কি-বোর্ডের ওপর আমার আঙুলগুলো আবার সচল হলো। ডার্ক ওয়েবের স্ক্রিনে নতুন এনক্রিপ্টেড ফাইলটা ওপেন হতেই এক্স-কমান্ডোর ক্ষীপ্র চোখ দুটো আবার সেই চেনা শীতলতায় ফোকাসড হয়ে উঠল। অবলার উদ্ধারকর্তা কিংবা যমদূত, নওরিনের দেওয়া এই নামগুলো আমার সিস্টেমে কেবলই কিছু অর্থহীন স্ট্রিং মাত্র। আমার সামনে এখন শুধুই একটা নতুন বাগ, যা ফিক্স করা জরুরি।

চলবে...

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ