তো, গত পর্বে আমি আপনাদেরকে আমার জীবনের পনেরো বছর আগের একটা ঘটনা জানাতে চেয়েছিলাম।
আসলে, ঐ ওষুধের ওভারডোজের প্রভাবটা এখনো কাটেনি। আমি এখনো কিছুটা ঘোরের মধ্যেই আছি।
ব্যাপার না, চলুন শুরু করা যাক।
আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। ক্লাস নাইনে পড়ুয়া অন্যান্য ছেলে-মেয়েদের চিন্তাধারা যেরকম হয়, আমার চিন্তাধারা তাদের থেকে সম্পূর্ণই আলাদা ছিল। ওই সময় আমার ক্লাসমেটদেরকে দেখতাম। তারা তাদের বিপরীত লিঙ্গের প্রতি বেশ আগ্রহী এবং সেগুলো নিয়ে আলোচনা করতে বেশ মজা পায়। তাদের সংলাপগুলো ছিল খুব জঘন্য। আমাদের স্কুলটাতে ছেলে ও মেয়েদের ক্লাস একসাথে হতো না।
ছেলে ও মেয়েদের ক্লাসের সময় ছিল আলাদা। ছেলে ও মেয়েদের স্কুল শুরু ও ছুটির সময়ও ছিল আলাদা আলাদা। তাদের পরেও আমাদের ক্লাসের ছেলেরা আমাদের একই ক্লাসের মেয়েদের সাথে কিভাবে যেন সম্পর্ক গড়ে তুলত। সবাই না, তবে কেউ কেউ করত।
আর এই ব্যাপারটা নিয়ে আমার মোটেই কোন আগ্রহ ছিল না। আমি আমাদের ক্লাসের কোন মেয়েকে চিনতামও না।
আমার আগ্রহের বিষয়বস্তু ছিল তখন Aerospace Technology এবং Automobile Technology এর উপরে।
আমি এমন একটা Engine Design করেছিলাম, যেটা পানি দিয়ে চলবে। মানে, বিদ্যুতের মাধ্যমে অক্সিজেন এবং হাইড্রোজেনকে বিভক্ত করা হবে এবং তাকে Pressure দিয়ে তরলীভূত করা হবে।
তারপর, এই দুটি তরল গ্যাসকে একই সাথে combustion chamber এ inject করা হবে। তো, এভাবেই চলতো ইঞ্জিনটা। যদিও আমি সেটা তৈরি করতে পারিনি তখন বিভিন্ন facility ও অর্থের অভাবে। পরে অবশ্য সেটা আবিষ্কৃত হয়েছে। তবে সেটা আমি আবিষ্কার করিনি; অন্য কেউ করেছে।
তো যখন আমি স্যারদের কাছে প্রাইভেট পড়তে যেতাম, আমাকে একটা হাইওয়ে দিয়ে হেঁটে যেতে হতো।
সেখানে প্রায় ট্রাক নষ্ট হতো। ট্রাকের হেল্পার, ড্রাইভার ও তাদের সাথে মেকানিকরা কখনো ইঞ্জিন, কখনো গিয়ার বক্স, কখনো ডিফারেনশিয়াল অ্যাক্সেল এগুলো খুলে কাজ করতো এবং আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেগুলো দেখতাম। এটাই ছিল আমার নেশা।
আমার বন্ধু-বান্ধবের সংখ্যা যদিও বরাবরই খুব কম, কিন্তু তাই বলে একেবারে যে একলা একলা থাকতাম তা তো নয়। দুই একজন ছিল। তার মধ্যে একজন ছিল হৃদয়।
তো হৃদয় একদিন ওর গার্লফ্রেন্ডের নাম সম্ভবত কনিকা ছিল। তো সেই নামটা তার হাত কেটে লিখে নিয়ে এসেছিল। যখন আমরা একসাথে থাকতাম, তখন ওরা যখন ওদের girlfriend বা এই বিষয়ক topic গুলো নিয়ে কথা বলত, তখন আমি left out feel করতাম। তখন আমার বয়স তো কম, আর ওই বয়স তো একটা ছেলের মাথায় যা কাজ করতে পারে। সেই হিসেবে আমারও মনে হতো যে, আমারও যদি এরকম কেউ থাকতো, যাকে নিয়ে আমি ওদের সাথে গল্প করব। কিন্তু আমার তো কেউ ছিল না। কারণ, এই বিষয় নিয়ে আমি কখনো মাথা ঘামাইনি।
তো, এটারও একটা সমাধান বের হলো এক রাতে। আমি সে রাতে "তারিন" বলে একটা মেয়েকে স্বপ্নে দেখলাম। তারিন নামটা জানতে পেরেছিলাম কারণ আমি আসলেই নামটা জিজ্ঞেস করেছিলাম স্বপ্নে। আমার কল্পনাশক্তি প্রখর। তখন আমি এই মেয়েটাকে নিয়ে কল্পনা করতে শুরু করি। এবং যা যা কল্পনা করতাম, তা আমি আমার বন্ধুদের সামনে এসে বলতাম। আর আমার বন্ধুদের নিকট ব্যাপারটাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করতে আমাকে সাহায্য করেছিল একটা ফ্যাক্ট। সেটা হলো, আমাদের ওখানেই পাশাপাশি দুইটা স্কুল ছিল। আমি আমার বন্ধুদেরকে বুঝিয়েছিলাম যে, ওই মেয়েটা, মানে তারিন, অন্য স্কুলটাতে পড়ে।
(আমি এখানে স্কুলের নাম উল্লেখ করছি না। কারণ, আপনারা বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না। এই ঘটনাটা সম্পূর্ণ সত্য।)
আর তারিনের সাথে তারা দেখা করতে পারবে না। কারণ আমি তাদেরকে বলেছিলাম, তারিনের বাবা একজন আর্মি অফিসার। তারিনরা অফিসার্স কোয়ার্টারে থাকে। তো সেখানে দল বেঁধে তাকে দেখতে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এভাবেই আমি তারিনকে আমার বন্ধুদের কাছ থেকে একরকম লুকিয়ে রেখেছিলাম, আবার প্রকাশ্যেও রেখেছিলাম। আসলে ওরা জানতই না যে "তারিন" বলে বাস্তবে কারো অস্তিত্ব নেই।
আমি তারিনকে নিয়ে করা কল্পনাগুলোই ওদের কাছে বলতাম। যেমন ধরুন, আজকে তারিনকে নিয়ে অমুক জায়গায় ঘুরতে গিয়েছিলাম। আজকে তারিনের সাথে এই বিষয়ে কথা হয়েছিল, তারিন তোদের কথা বলছিল। আবার কখনো বা ফোনের রিংটোন বাজিয়ে ফোন এসেছে এমন দেখিয়ে ফোনটা কানে ধরে, শুধু শুধুই ফোনে তারিনের সাথে কথা বলার অভিনয় করতাম ওদের সামনে। আর আমার তারিনকে নিয়ে ওদের সামনে বলা কথাগুলো এতটাই বাস্তবিকভাবে আমি তুলে ধরতাম যে ওরা ব্যাপারটা ধরতে পারেনি কখনোই। এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ওরা কখনো ধরতে পারতোও না।
এভাবেই দেখতে দেখতে এসএসসি পরীক্ষা চলে আসলো। কিন্তু আমিও তো মানুষ। আমারও তো ইচ্ছা করতো বাস্তবেও আমার জন্য কেউ থাকুক। আমি তো জানতাম যে তারিন বলে কারো অস্তিত্ব নেই। এটা শুধুই আমার কল্পনা।
কিন্তু এই কল্পনাটাই আমাকে এমনভাবে আস্ত্রেপেষ্ট্রে জড়িয়ে ধরেছিল যে আমি এটাকেই বাস্তব ভাবতে শুরু করেছিলাম।
এক পর্যায়ে আমি আমার বন্ধুদেরকে এই বিষয়টা জানিয়ে দিই। তখন ওরা কিছুটা shocked হয়। কিন্তু তারপর আমাকে বোঝায়, যেভাবে কল্পনাকে জড়িয়ে ধরে, তো জীবন পার করা যায় না।
বাস্তবে একজন মানুষকে খোঁজো, যে তোমার এই অভাবটা পূরণ করে দিবে। এটাই ছিল ওদের আমাকে দেওয়া সবচেয়ে বড় ভুল নির্দেশনা।
তো, এসএসসি পরীক্ষার পরে আমি আমার এক চাচার বাসায় বেড়াতে যাই। আমার একটা চাচাতো বোন ছিল সেখানে। তার নাম নিহা। ওরা এক ভাই, এক বোন। আমার মূলত নিহার ছোট ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক বেশি ভালো ছিল। তো সেখানে গিয়েই নিহার সাথে আমার প্রথম একটা interaction হয়। যেটা এর আগে অন্য কোনো মেয়ের সাথে কখনোই হয়নি। আমি জানতামই না, এই অনুভূতিটা কেমন হয়। আমি যখন ওদের বাড়িতে ছিলাম, তখন ওদের বাড়ির পিছনে একটা পুকুর মতোন ছিল। এখন অবশ্য সেটা নেই। কিন্তু সেটা মূল কথা নয়।
হঠাৎ একদিন জানালা দিয়ে দেখি পুকুরটাতে একটা বেড়ালের বাচ্চা পড়ে গিয়েছে। পুকুরটায় এমন পানি ছিল না যে বাচ্চাটা ডুবে মারা যাবে। কিন্তু চারিপাশে উঁচু পাড় থাকার কারণে, আর পাড়টা ঢালাই করা থাকার কারণে, বেড়ালের বাচ্চাটা উঠতেও পারছিল না। তো তখন আমরা তিনজন যাই ওই পক বেড়ালের বাচ্চাটাকে উদ্ধার করতে। উদ্ধার করিও, কিন্তু ফিরে আসার সময়ে আমাদেরকে একটা প্রাচীরের উপর দিয়ে আসতে হতো। আমি আর নিহার ছোট ভাই দুজনেই লাফ দিয়ে প্রাচীরের উপর উঠে পড়ি।
কিন্তু নিহা উঠতে পারছিল না। ওর সাহায্য লাগত। তখন নিহা আমাকে আমার দুই হাত বাড়াতে বলে। মানে, নিহা যেটা বলতে চাচ্ছিল, সেটা হলো আমি যেন ওকে হাত ধরে টেনে প্রাচীরের উপরে তুলি। আমি একটু ইতস্তত করে এক পর্যায়ে আমার দুই হাত বাড়িয়ে দিই। ও, আমার হাত দুটো ধরে। এই প্রথম আমি কোন মেয়ের হাত ধরলাম। অনুভূতিটা অসাধারণ ছিল। মানে, সেটা ভাষায় বর্ণনা করা যাবে না। সম্ভব নয়।
নিহার সাথে সম্পর্কটা ক্লোজ হতে শুরু করল। চাচা অফিসে যেতেন। সে সময় চাচীর দাঁতের একটা treatment চলছিল। তো চাচী যেতেন dentist-এর কাছে।আর নিহার ছোট ভাই যেত স্কুলে। আর কি একটা কারণবশত তখন যেন নিহার college বন্ধ ছিল। হ্যাঁ, ও আমার এক বছরের সিনিয়র ছিল। তখন আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা একলা সময় কাটিয়েছি, গল্প করেছি। একটা অন্যরকম বন্ড তৈরি হয়ে গেছিল আমাদের মধ্যে। ওর প্রতি একটা emotion জন্মেছিল। তারপর যেদিন ওদের বাড়ি থেকে আমি আমাদের গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিব, সেদিন রাতের বেলায় রাত তিনটা পর্যন্ত আমি আমার এই কাল্পনিক তারিনের কথা পরিপূর্ণভাবে ওর সাথে শেয়ার করি। তখন ও আমাকে বলে যে,
“তুমি যদি আমাকে এটা এর এক সপ্তাহ আগে বলতে, তাহলে আমি তোমার এই সমস্যাটা সম্পূর্ণভাবে ঠিক করে দিতে পারতাম।”
আরও অনেক কথা হয়েছিলো, অনেক ঘটনা ঘটেছিল সে রাতে। সবকিছু এখানে উল্লেখ করছি না।
মানুষের মস্তিষ্ক একটা অদ্ভুত জিনিস। এটা যে হুট করে কখন কোন কিছুকে অবলম্বন করে বসবে, তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। আমার ক্ষেত্রে যে ঘটনাটা ঘটলো, সেটা হলো তখন এই কাল্পনিক তারিনের বদলে আমার সমস্ত কল্পনা নিহাকে ঘিরে আবর্তিত হতে শুরু করলো। ঠিক আমার ওই বন্ধুদের কথার মতো, কাল্পনিক চরিত্রটা পেল একটা বাস্তব রূপ।
তারপর, আমার বাবার পোস্টিং হয়ে যায় চট্টগ্রামে। সেখানে আমার নতুন বন্ধুও হয়। চট্টগ্রামে আব্বার পোস্টিং হলেও, আমি ভর্তি হয়েছিলাম যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজে। সেখানেও দুই একজন বন্ধু হয় আমার।
তখন আমি নিহার সাথে প্রতি একদিন পর পর রাতে কথা বলতাম।
খুব বেশি কথা বলতাম না। এই দুই থেকে পাঁচ মিনিট।
তখন নিহাকে নিয়ে করা কল্পনাগুলো আমি আমার নতুন বন্ধুদের সাথে আগের মতোই বলতে শুরু করলাম। তখন আমার বয়স ১৫ বছর হবে। তখন আমি কল্পনা করতাম, নিহা ও আমার একটি কন্যা সন্তান আছে, যার নাম অরনী। এবং কোনো একটি অস্বাভাবিক ঘটনা প্রবাহের কারণে আমরা বিয়ে করেছি।
(এই ঘটনা প্রবাহটা জানতে চাইলে আমার লেখা “গল্পটা আমার ও তার” গল্পটি আপনাদেরকে পড়তে হবে। না হলে ওই পুরো গল্পটিও আমাকে এখানে লিখতে হবে এবং সেটা নিশ্চয়ই আপনাদের ভালো লাগবে না। এখানেই আছে মানে এই সাইটেই। আপনাদের কৌতূহল জাগলে পড়ে নিতে পারেন। ঘটনাটি যেহেতু আমার ব্যক্তিগত ভাবে পরিচিত বেশ কয়েকজনকে বলা হয়েছে, তাই চরিত্রগুলোকে সেখানে ভিন্নভাবে, ভিন্ন নামে লেখা হয়েছে। কিন্তু আমি এখন যেটা লিখছি, তা সম্পূর্ণ সত্য ঘটনা শুধু নামগুলো পরিবর্তন করে দিয়েছি। কাজেই, আপনাদের কিছুটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হতে পারে ওই গল্পটা।আপনারা অনুগ্রহপূর্বক মানিয়ে নেবেন।)
আমি আগেই আমার চরিত্র সম্পর্কে আপনাদেরকে কিছুটা ধারণা দিয়েছি। একাধিক মেয়েদের পিছনে দৌড়ে বেড়ানোর মতো লোক আমি না। আমি মূলত ওই কল্পনাটাকেই বাস্তব বলে বিশ্বাস করতাম। বরং আগের কল্পনাটার থেকেও অনেক বেশি বাস্তব হিসেবে। কারণ এখানে নিহা কাল্পনিক ছিল না। বাস্তবে তার অস্তিত্ব ছিল। নিহাকে আমি আমার স্ত্রী হিসেবেই মনে করতাম এবং অরনি ছিল আমাদের সন্তান।
এভাবে এগারোটা বছর আমি দ্বিতীয় কোনো নারীর দিকে তাকাইনি পর্যন্ত। আমার ধ্যান, জ্ঞান, কল্পনা, বাস্তব সবই ছিল নিহা আর অরনি। বিএমএ, অর্থাৎ বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে চার বছর ট্রেনিং বাদে আমার চাকরির বয়স হয়েছিল পাঁচ বছর। ( আপনারা ভাবতে পারেন, একজন প্যারাকমান্ডো কিভাবে এগারো বছর একটি কল্পনার পিছনে obsession এ ভুগতে পারে এবং এরকম একটি সার্ভিস থেকে ইস্তফা দিতে পারে। আমি কোন টিনএজ বালকের মতো obsession-এ ভুগে বসে ছিলাম না। আমি নিজেকে prepare করছিলাম নিহার জন্য। It was a plan.) আমি এই চাকরিটা শুধু নিয়েছিলাম শুধুমাত্র যোগ্য হয়ে ওঠার জন্য। যেহেতু ও আমার এক বছরের সিনিয়র, তাই ইন্টার পাশের পর এই চাকরি নেওয়া ছাড়া আমার সামনে কোনো option ছিল না। আমি কখনো কল্পনাই করতে পারিনি যে নিহা অন্য কারো হতে পারে।
কিন্তু একটা জিনিস কি জানেন? একটা সম্পর্ক তৈরি করতে হলে এবং টিকিয়ে রাখতে হলে দুই দিক থেকেই effort লাগে। এখানেই আমার সবচেয়ে বড় ভুলটা হয়েছিল। যে আমার তরফ থেকে কোন effort-ই ছিল না। আমি নিহাকে নিজের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করতাম। ২০২০ সালে নিহা একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ডাক্তারি পাশ করে বের হয়। এরই মধ্যে আমার অজান্তেই আমাদের দুজনের গতিপথ নিয়মিত কয়েক ডিগ্রি করে সরে যেতে যেতে সম্পূর্ণ দুদিকে চলে গেছে। যেন গভীর সমুদ্রে দুটি জাহাজ চলছে একই রুট ধরে। তার মধ্যে একটি গতিপথ কয়েক ডিগ্রি বেঁকে গেল। একটা সময় পর দেখা যাবে দুটি জাহাজ পৃথিবীর দুই প্রান্তে পৌঁছে গেছে। ঠিক সেরকম।
আর এমনটা হবেই না বা কেন? ছোট্ট একটা ঝগড়া হয়েছিল আমাদের মধ্যে । তখন আমার আবেগ ছিল। যার পরিপ্রেক্ষিতে, এই দীর্ঘ এগারোটা বছর, দুই একটা মেসেজ ছাড়া, টেক্সট মেসেজ ছাড়া, ওর সাথে কোন যোগাযোগই হয়নি আমার। আর সামনা-সামনিও দেখা হয়েছে খুব জোর তিন-চারবার। তখন হয়তো দুই একটা শব্দের আদান-প্রদান হয়েছে। এর বেশি কিছু না। কিন্তু এইটুকুকেই আমি অনেক বেশি ধরে নিয়েছিলাম। যে, ও আমার, আমারই থাকবে। নাহ্, থাকে নি!
( আপনারা ভাবতে পারেন, এই দীর্ঘ এগারো বছরের মধ্যে দুই একটা মেসেজ, টেক্সট মেসেজ ছাড়া, ওর সাথে কেন কোন যোগাযোগ হয়নি? আসলে ব্যাপারটা হচ্ছে, বিএমএ-তে ট্রেনিংয়ের সময় মোবাইল ব্যবহার করা যায় না। তাছাড়া, তার মধ্যে ছুটিছাটাও খুব কম। আর ঝগড়াটা হওয়ার পর আমি ওকে খুব একটা বিরক্তও করতে চাইতাম না।
কথা বললে ও উত্তর দিত, কিন্তু নিজে থেকে কিছু বলত না। ব্যাপারটা আমাকে hurt করতো। তাই আমি চুপ থাকাটাকেই logical মনে করেছিলাম। আসলে এখানে আসল কথা হচ্ছে, গতিপথ অনেক আগেই পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল, হয়তো BMA তে training এ থাকা অবস্থাতেই। জানিনা, এসব বলতে ভালো লাগছে না। )
সম্ভবত ২০২২ সালের শেষের দিকে, সম্ভবত নভেম্বর মাসে, একদিন বিকালে আমি আর আমার এক batch mate সাইকেল নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছিলাম।
সে সময় আমরা ঢাকায় পুরো পরিবার একসাথে থাকতাম। সেদিন গাড়িটা নিয়ে যাইনি; দুজন দু'টা সাইকেল নিয়ে বেরিয়েছিলাম।
আমার বাবা আমাকে বললেন যে “তিনি, আমার মা আর আমার ছোট ভাই নিহাদের বাসায় যাচ্ছেন।
তো আমি জিজ্ঞেস করলাম, হঠাৎ ওদের বাসায় এখন যাওয়ার কি প্রয়োজন পড়লো?
আমার বাবা আমাকে বললেন যে “তোমার চাচী অসুস্থ। তাকে একটু দেখতে যাব।”
তো আমি বললাম, "তুমি তো গাড়ি চালাতে পারো না। তুমি গাড়ি নিয়ে যাবে কি করে?"
বাবা বললেন, “একজন ড্রাইভারের ব্যবস্থা করা হয়েছে, অসুবিধা নেই।”
অবশ্য তিনি আমাকে একবারও যাওয়ার কথা বললেন না। আর ব্যাপারটাকে আমি খুব একটা আমলেও নেইনি। কারণ আমার আর আমার ব্যাচমেটের সেদিন ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান।
আমি বেশ সকাল সকালই বেরিয়ে গেলাম। কারণ সাইকেল নিয়ে আমাদের দুজনের অনেক দূর cover করার পরিকল্পনা ছিল সেদিন।
তো সারাদিন ঘোরার পর সন্ধ্যার দিকে আমরা এসে পৌঁছালাম ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের গ্যারিসন মসজিদের কাছাকাছি। তখনই মাগরিবের আজান হলো।
আমার ব্যাচমেট আমাকে বলল, "চল নামাজটা পড়ে আসি।"
তখন আমি ওকে বললাম, "আজকে তুই পড়ে আয়। আমি বাইরে তোর জন্য অপেক্ষা করছি।"
তো মসজিদের বাইরে বসে অপেক্ষা করতে করতে, হঠাৎ কেন যেন নিহার আইডিটা লিখে ফেসবুকে সার্চ করলাম। ও আমার friend list-এ add ছিল না। কারণ ওই ছোট্ট ঝগড়াটা।
Profile picture টা দেখে আমি থমকে গেলাম। Profile picture এ ওর আর ওর husband এর একটা couple pic দেওয়া। আমি আগে ভাবতাম, এরকম কোন দৃশ্য যদি আমি কখনো দেখি, আমি হয়তো আর জীবিত থাকবো না।
কিন্তু সত্যি বলতে কি, তেমন কিছুই হলো না। আমি শান্তভাবেই বসে ছবিটা দেখতে লাগলাম।
নামাজ শেষে ব্যাচমেট বেরিয়ে আসার পর, তাকে ছবিটা দেখিয়ে বললাম, "নিহা তো বিয়ে করে ফেলেছে।"
ওকে দেখে মনে হলো, আমার থেকে বেশি ওই তাজ্জব হয়েছে ব্যাপারটাতে।
আর আরো বেশি তাজ্জব হয়েছে আমার এই শান্ত রূপ দেখে।
ও আমাকে বলল,
“চল ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট রেলওয়ে স্টেশনে যাব। এখন বাসায় যেতে হবে না তোকে।”
আমিও বললাম, "চল যাই।"
ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে মাঝখানের নির্জন প্ল্যাটফর্মটাতে আমি আর ও বসলাম।
আমি ওকে বললাম, "জানিস, আমার পরিবার আজকে নিহার বিয়েতে গিয়েছিল।"
ও আমাকে বলল, "তুই যে বললি তোর চাচী অসুস্থ, তাদেরকে দেখতে গিয়েছেন তোর পরিবার?"
আমি ওকে বললাম, “সম্ভবত আমাকে পরিকল্পিতভাবে Misguide করা হয়েছে।
আমার পরিবার হয়তো ধারণা করেছে, আমি যদি এটা জানতে পারি, তাহলে নিহার বিয়ে বাড়িতে গিয়ে আমি একটা ঝামেলা পাকাতে পারি। কারণ তারা জানে যে, সেই ক্ষমতা আমার আছে।”
আমার batch mate আমাকে বলল, "তুই এখন এত শান্ত আছিস, কি করে?"
সত্যি কথা বলতে কি জানেন? তখন এই প্রশ্নটার কোনো উত্তর আমার কাছে ছিল না।
আর বাইরে থেকে আমাকে দেখে বোঝাও যাচ্ছিল না। কারণ আমি হাসছি, কথা বলছি, সিগারেট খাচ্ছি; কিভাবে বুঝবে আরেকটা মানুষ?
আমি শুধু একটা প্রতিক্রিয়া আমার ব্যাচমেটকে বললাম। যে,
“ওর হাজবেন্ড শুয়োরের বাচ্চাটার information টা বের করতো।”
এটা আমাদের কাছে খুব একটা কঠিন বিষয় না।
মিনিট দশেকের মধ্যে রিপোর্ট পেয়ে গেলাম শুয়োরের বাচ্চাটা front end developer। মানে, একটা কর্পোরেট ডমেস্টিক অ্যানিমেলকে বিয়ে করেছে নিহা।
জানেন, নিহা, আমার পৃথিবী ছিল। আমার কাছে এমন মনে হচ্ছিল যে আমি চাঁদে গিয়েছি। আর সেখান থেকে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ একটা asteroid পৃথিবীকে আঘাত করে আমার চোখের সামনে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল। সব শেষ। যা হয়ে গেছে, তাই Irreversible।
এই ঘটনার মাসখানেক পরে,
মেন্টাল হেলথ ইস্যু দেখিয়ে resignation letter পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। কার জন্য করব এসব? আমার পৃথিবীটাই তো আর নেই।
সবার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলাম।
শীতলক্ষ্যার পাড়ে ফ্ল্যাটটা কিনলাম। তারপরেই শুরু হলো আমার নতুন জগতে বসবাস।
এই জগৎ ঘন তরল পিচ্ছিল অন্ধকার বিশিষ্ট। এই জগতের atmosphere টা অনেকটা হাজার মিটার গভীর সমুদ্রের অন্ধকার তলদেশের মতো নিস্তব্ধ। যেখানে না কোন শব্দ যায়, না যেখান থেকে কোন শব্দ ফেরত আসে।
জানেন, নিহার একটা মেয়ে হয়েছে। নাম ফাবিহা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ফাবিহার বাবা আমি নই। এটাই হয়তো আল্লাহর চাওয়া ছিল। তার চাওয়াকি আমরা পরিবর্তন করতে পারি? এটা হলো তকদির।
ওর husband শুয়োরের বাচ্চাটাকে কয়েকবার পিষে ফেলার যে plan করিনি, তা না। কিন্তু পরে ভাবলাম, কি লাভ?
আর একটু ঘাটাঘাটি করে জানতে পেরেছি, ওদের নাকি প্রেমের সম্পর্ক ছিল। স্রেফ এই কারণটাতে শুয়োরের বাচ্চাটা বেঁচে গেছে, কারণ এতে সবচেয়ে বেশি আঘাতটা পেত নিহা। নেহার সন্তানটা এতিম হয়ে যেত। শুয়োরের বাচ্চাটা নিহার ডাক্তারি ক্যারিয়ারটাও আর এগিয়ে নিয়ে যেতে দেয়নি। নিহা এখন পুরোদস্তুর হাউজওয়াইফ।
নিহার বিয়ের পরে একবার ওর সাথে দেখা হয়েছিল। আমার আরেক কাজিনের বিয়েতে। তাকিয়ে শুধু দেখেছি, কোন কথা বলিনি।
(এই পর্যন্ত ঘটনাটি সত্য।)
হঠাৎ নওরীন আমাকে ডাকলো, “এনাম।”
আমি ধীরে ধীরে ওর দিকে তাকালাম।
নওরিন বলল, "এখন কেমন লাগছে? আর এমন কি গভীর ভাবনায় ডুবে আছো তুমি? আমাকে বলা যায় কি?"
আমি উত্তর দিলাম। “কিছুটা ভালো লাগছে। আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দেবে নওরীন ?
আর কেন বলা যাবে না? নেহার কথা ভাবছিলাম।”
নওরীন পরম মমতায় আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। যদিও মেয়েটা নিজেই খুব ক্লান্ত, কিন্তু আমি কেন জানি চাচ্ছিলাম, ও আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিক।
ক্লান্ত তো মানুষ থাকেই, তাই না?
নওরীনের হাতের স্পর্শে অদ্ভুত একটা মায়া ছিল। আমার মতো একটা 'রোবট' বা 'সাইকোপ্যাথ'-এর মাথায় সে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, ব্যাপারটা লজিক্যালি মেলাতে পারছিলাম না। কিন্তু ওই যে বললাম, ওষুধের প্রভাব! আমার নিউরনগুলো হয়তো সাময়িকভাবে লজিক খোঁজা বন্ধ করে দিয়েছে।
পুরো ঘরটা সেই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ডুবে আছে, শুধু ওর হাতের উষ্ণতা আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে আমি এখনো বেঁচে আছি।
"তুমি কষ্ট পেয়েছ, এনাম।" নওরীন খুব শান্ত গলায় বলল। "অনেক বেশি কষ্ট পেয়েছ। আর সেই কষ্ট থেকে পালাতে গিয়েই তুমি নিজেকে এই অন্ধকারের খাঁচায় বন্দি করেছ।"
আমি চোখ বন্ধ করেই ছিলাম। বললাম, "কষ্ট? আমি আবেগহীন মানুষ নওরীন। আমার কোনো কষ্ট নেই। আমি শুধু একটা লজিক্যাল কনক্লুশনে পৌঁছেছি যে, এই দুনিয়াটা একটা সিস্টেম এরর। আর নিহা ছিল সেই এররের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।"
নওরীন আমার চুলে বিলি কাটতে কাটতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "তুমি নিজেকে যতই পাথর ভাবো না কেন এনাম, তুমি পাথর নও। তুমি যদি সত্যিই আবেগহীন হতে, তাহলে নিহার স্বামী বা তার সংসার নিয়ে তোমার বিন্দুমাত্র কোনো প্রতিক্রিয়া থাকতো না। তুমি এসএসজি ছাড়তে না। তুমি আসলে একটা আহত মানুষের মতো আড়াল খুঁজছিলে।"
আমি চোখ খুললাম। নওরীনের চোখের দিকে তাকালাম। ওর চোখে কোনো করুণা নেই, আছে একটা গভীর বোঝাপড়া।
"আমি নিহার ওই 'শুয়োরের বাচ্চা' ফ্রন্ট এন্ড ডেভেলপারটার কোনো ক্ষতি করিনি, নওরীন," আমি নিচু গলায় বললাম। "কারণ আমি জানতাম, লজিক্যালি ওই কাজটা করলে নিহার জীবনটাই ধ্বংস হবে। আর নিহার ধ্বংস মানে আমার ওই এগারো বছরের কল্পনার কফিনে শেষ পেরেকটা ঠুকে দেওয়া।"
নওরীন হঠাৎ করে ওর হাতটা আমার গাল ছুঁয়ে দিল। "তুমি একটা ঘোরের মধ্যে বেঁচে ছিলে এনাম। অরনী, নিহা... এরা তোমার কল্পনার একটা সেফ জোন ছিল। বাস্তবতার ধাক্কাটা তুমি নিতে পারোনি। কিন্তু দেখো... বাস্তবতা সবসময় খারাপ হয় না।"
আমি ভ্রু কুঁচকালাম। "বাস্তবতা ধূসর বা কালো যা আলো শোষে নেয়, নওরীন। ঠিক এই ঘরটার মতো।"
"না।" নওরীনের গলাটা এবার একটু দৃঢ় শোনাল। "তুমি এই ঘরটাকে Musou Black পেইন্ট দিয়ে রাঙিয়েছ আলোর ৯৯.৪% শুষে নেওয়ার জন্য । কিন্তু তারপরও তুমি একটা মনিটর জ্বালিয়ে রাখো, ডেল্টা ফোর্স গেম খেলো । তুমি পুরোপুরি অন্ধকারে থাকতে পারো না। ঠিক তেমনি, তুমি নিজেকে যতই আবেগহীন বলো, তুমি অবলা প্রাণীর বিপদে ঠিকই এগিয়ে যাও। ওই মেয়েটার বিড়ালগুলোকে তুমি নিয়ে এসেছিলে । আমাকে ওই রাতে তুমিই বাঁচিয়েছিলে । এগুলো কোনো লজিক নয় এনাম, এগুলো তোমার ভেতরের মরে যাওয়া মানুষটার বেঁচে থাকার লড়াই।"
আমি আর কোনো তর্ক করলাম না। হয়তো তর্ক করার মতো শক্তি আমার ছিল না, অথবা নওরীন এমন একটা সত্যি কথা বলে ফেলেছিল যার কাউন্টার লজিক আমার কাছে তৈরি ছিল না।
কিছুক্ষণ পর নওরীন নিচু স্বরে বলল, "নিহা ওর জীবন গুছিয়ে নিয়েছে। ওর একটা মেয়েও আছে, ফাবিহা। তুমিও তো চাইলে নতুন করে শুরু করতে পারো, এনাম? এই ব্ল্যাক হোল থেকে বেরিয়ে আসতে পারো?"
আমি সিলিংয়ের দিকে তাকালাম। "কোথায় যাব? আমার তো আর কোনো পৃথিবী নেই।"
নওরীন আমার হাতটা ওর দুই হাতের মাঝে নিয়ে খুব শক্ত করে ধরল। "নতুন পৃথিবী তৈরি করতে হয়। আমি তো আছি। আমি হয়তো তোমার কল্পনার তারিন বা নিহা নই। কিন্তু আমি বাস্তব। তুমি আমাকে ছুঁয়ে দেখতে পারো।"
ওর কথাগুলো আমার মস্তিষ্কে একটা নতুন ডেটা ইনপুট হিসেবে প্রবেশ করল। আমি বরাবরই ফ্যাক্টস আর ডেটা নিয়ে কাজ করি। আর এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টস হলো আমার এই জমাট বাঁধা অন্ধকারে নওরীন নামের একটা আলো জোর করে ঢুকে পড়েছে। এবং অদ্ভুতভাবে, আমার ভেতরের 'অ্যান্টিভাইরাস' তাকে ব্লক করছে না।
আমি একটা শুষ্ক হাসি হাসলাম। "একজন সাইকোপ্যাথ ফ্রিল্যান্সারের সাথে বাস্তব পৃথিবী বানাতে চাও ডাক্তার? তুমি জানো না তুমি কতটা রিস্ক নিচ্ছ।"
নওরীনও হাসল। ওর সেই হাসিটা, যা আমি প্রথম দিন দেখেছিলাম। "আমি রিস্ক নিতে জানি এনাম।
চলবে…

0 মন্তব্যসমূহ