তো সোফায় হেলান দিয়ে বসে চিন্তা করতে করতে আমি এক পর্যায়ে ঘুমিয়ে গেলাম। বলা যায়, বেশ কিছুক্ষণই ঘুমিয়ে ছিলাম।
তো, ঘুম থেকে উঠে আড়া মোড়া ভেঙে কম্পিউটারটা অন করলাম।
সব
সময় তো আর গেম খেলি না। মাঝে মাঝে ফেসবুক স্ক্রলও করি। তো, বেশ রগরগে একটা
ধর্ষণের ঘটনা সামনে আসলো। ছবি সহ। মহিলা গর্ভবতী ছিলেন। ধর্ষণ করার সময়
বাচ্চাটাকে বের করে ফেলেছে তারা। আর ওই অপরিপক্ক বাচ্চাটাকে তার মাকে
হত্যার পর তার মায়ের সামনেই ফেলে রেখে গেছে। শুয়োরের বাচ্চারা। আমি
দুঃখিতও হলাম না। শুধু ঘটনাটা দেখলাম। আমার মধ্যে কোন আবেগ অনুভূতি নেই।
মনে মনে মাদারচোদ বলে আবার স্ক্রল করে গেলাম। এই মুহূর্তে আমার মনে হলো,
একটু কফি খেতে পারলে মন্দ হতো না। তো কফি বানিয়ে নিয়ে এসে আবার বসলাম
কম্পিউটারে।
আমার ভেতরে যে philosopher character টা আছে, সেটা
জেগে উঠলো আমার মধ্যে। সেটা বলতে শুরু করলো, এখন একটা নতুন সমস্যা তৈরি
হয়েছে। সেটা হলো যে অপরাধীরা তাদের অপরাধের যে শাস্তি, সেটা সম্পর্কে তারা
ভাবছে না। কারণ,
প্রথমত, তারা মনে করছে যে তারা ধরা পড়বে না।
দ্বিতীয়ত, তারা যদি ধরা পড়েও, তাদেরকে প্রথমে পুলিশ গ্রেফতার করবে, জেলে নেবে, কোর্টে চালান করবে। তারপর কারাগারে পাঠাবে।
এরপর, ছয় মাস বা এক বছর পর কোনো না কোনোভাবে জামিনে বের হয়ে আসবে।
আসলে এদেশের বিচারিক ব্যবস্থাটাই এরকম।
তো যাই হোক, আমি সেটা নিয়ে ভাবা বন্ধ করলাম। কারণ ইতিমধ্যে আমি একটা অহেতুক, অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে বেশিই ভেবে ফেলেছি।
সোফায় হেলান দিয়ে কফির মগে শেষ চুমুকটা দিলাম। তেতো স্বাদটা জিহ্বায় লেগে আছে। স্ক্রিনে ওই বীভৎস খবরটা এখনো স্থির হয়ে আছে। আধুনিক সভ্যতার নিচে চাপা পড়া আদিম পাশবিকতা। আমার ভেতরের ফিলোসফার সত্তাটা এবার মুচকি হাসল। অপরাধীরা কেন অপরাধ করে, তার সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়ে লাভ নেই। মূল কারণটা খুব সহজ ভয়। তাদের মস্তিষ্কে শাস্তির কোনো ভয় নেই। এদেশের বিচারিক ব্যবস্থা তাদের কাছে এক ধরণের সেফটি নেট বা নিরাপত্তা জালের মতো। একবার সেই জালে ঢুকতে পারলে উকিল-মুক্তার আর আইনি মারপ্যাঁচে তারা ঠিকই গলিপথ বের করে নেয়।
কিন্তু আমার ডার্ক রুমের আইন আলাদা। এখানে কোনো জামিন নেই, কোনো দীর্ঘমেয়াদী শুনানি নেই। এখানে শুধু আছে 'লজিক্যাল কনক্লুশন'।
হঠাৎ আমার সেকেন্ডারি ফোনটা আবার ভাইব্রেট করে উঠল। আমি জানি, শহীদুল কিংবা তার মতো কেউ একজন এখন এই মুহূর্তের পরিস্থিতিটা উপভোগ করছে। আমি ফোনটা হাতে নিলাম। কোনো মেসেজ নেই, শুধু একটা লোকেশন পিন করা হয়েছে। সাভারের কাছাকাছি কোথাও।
একই সাথে একটা অডিও ক্লিপ আসল। প্লে করতেই সেই পরিচিত গম্ভীর কণ্ঠ “এনাম সাহেব, ফেসবুকের ওই খবরটা আপনার নজর এড়ায়নি নিশ্চয়ই? সমাজ যখন পচে যায়, তখন কিছু সার্জিক্যাল ইন্টারভেনশনের প্রয়োজন হয়। আপনি তো ফ্রিল্যান্সার, আর আমরা হলাম সেই ইনস্ট্রুমেন্ট যা দিয়ে সমাজকে পরিষ্কার করা হয়। আজ রাতের মিশনটা আপনার জন্য একটা ‘টেস্ট কেস’ হতে পারে।”
আমি ফোনটা টেবিলের ওপর রাখলাম। আমার চোখের সামনে যেন সেই গর্ভবতী মহিলার নিথর দেহ আর ওই নিষ্পাপ শিশুটার রক্তমাখা মুখটা ভেসে উঠল। আমার কোনো আবেগ নেই, আমি রোবট নিজেকে বারবার এই কথাটাই মনে করিয়ে দিই। কিন্তু রোবটদেরও তো একটা অ্যালগরিদম থাকে। আর আমার অ্যালগরিদমে এই ধরণের ইকুয়েশন কোনোভাবেই ব্যালেন্সড হয় না।
আমি কম্পিউটারের স্পিকারের ভলিউমটা বাড়িয়ে দিয়ে আবার ‘ডেল্টা ফোর্স’ গেমটা ওপেন করলাম। কিন্তু এবার আর আমি ভার্চুয়াল ম্যাপে ফোকাস করতে পারছি না। কিবোর্ডের ওপর আঙুলগুলো স্থির হয়ে আছে।
আমি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। শীতলক্ষ্যার ওপারের আকাশটা এখন ঘন কালো। কুয়াশা নেই, কিন্তু বাতাসটা ভারী। আমি বুঝতে পারছি, আমার এই শান্ত, একঘেয়ে ‘শ্যাডি’ জীবনে একটা বড় ধরণের ঝড় আসতে যাচ্ছে। নওরীন কাল সকালে আসবে বলেছিল। সে হয়তো আরও কিছু খবর নিয়ে আসবে। সে হয়তো জানে না, সে যে আগুনের সাথে খেলছে, তার শিখা আমার এই ডার্ক রুম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
আমি রুমের লাইটটা একদম বন্ধ করে দিলাম। শুধু ওলেড প্যানেলের নীলচে আলোতে ঘরটা আবছা আলোকিত হয়ে রইল। আমি জানি, এই অন্ধকারের মধ্যেই ইরা দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো সেও বিচার চায়। হয়তো সেও চায় আমি যেন ওই ‘শুয়োরের বাচ্চাদের’ একটা উচিত শিক্ষা দিই।
আমি বিড়বিড় করে বললাম, “বিচার করার মালিক আমি নই, কিন্তু বিচারের পথটা তো তৈরি করে দিতে পারি।”
আমার পকেটে রাখা সেই বিশেষ ক্যামেরাটা বের করলাম। জুম লেন্সটা চেক করে নিলাম। আজ রাতে ফটোগ্রাফি হবে, তবে বিমানের নয়। আজ রাতে ছবি উঠবে মানুষের ভেতরকার জানোয়ারগুলোর।
হঠাৎ ইন্টারকমটা বেজে উঠল। এই গভীর রাতে আবার কে? আমি রিসিভার তুললাম না। আমি জানি ওটা কে হতে পারে। হয়তো শহীদুল, নয়তো নতুন কোনো এক দুঃসংবাদ।
আমি আমার কালো জ্যাকেটটা গায়ে জড়িয়ে নিলাম। ডার্ক রুমের দরজাটা লক করার আগে একবার পেছনে ফিরে তাকালাম। আমার এই Musou Black দেওয়ালগুলো যেন আমাকে বলছে ‘ফিরে এসো এনাম, এই অন্ধকারই তোমার আসল ঘর।’
আমি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে শুরু করলাম। লিফট ব্যবহার করলাম না। আজ রাতে আমার পায়ের প্রতিটি শব্দ আমি শুনতে চাই। আজ রাতে গেমটা আর কম্পিউটারের স্ক্রিনে সীমাবদ্ধ নেই। আজ রাতে আমি নিজেই সেই ‘ডেল্টা ফোর্স’-এর কমান্ডো।
গাড়ির স্টার্ট দেওয়ার শব্দে রাতটা যেন একবার কেঁপে উঠল। আমার BMW M5-এর হেডলাইট দুটো যখন সামনের রাস্তাটাকে চিরে দিল, তখন আমি বুঝলাম এই যাত্রার কোনো শেষ নেই। এটা কেবল এক অন্তহীন শুরুর প্রথম পদক্ষেপ।
“Next mission is not loading anymore... It’s live now.”
তো দুদিন যখন গাড়ি নিয়ে ফিরলাম, গাড়িটা বেশ কর্দমাক্ত ছিল। আসলে, ওদিককার রাস্তাটা খুব একটা ভালো না। গাড়িটা ওয়াশ করে নিয়ে আসলেই ভালো করতাম। কিন্তু যেতে ইচ্ছা করছিল না, কারণ ক্লান্ত লাগছিল।
বিল্ডিংয়ের কেয়ারটেকারকে বললাম, “গাড়িটা বেশ ভালো করে ধুয়ে রাখবে তো? তোমাকে চা পানির খরচ দিব। যত্ন করে পরিষ্কার করবে কিন্তু।”
তো,
আমার ওই **dark room**-এ ফিরেই আমি একটা লম্বা ঘুম দিলাম। কারণ, আমি গত
দুই দিন যাবত বেশ কিছু কাজ করে এসেছি, যার পরিপ্রেক্ষিতে আমি ক্লান্ত।
তো
কাজগুলো করতে গিয়ে আমি একটা জিনিস উপলব্ধি করতে পারলাম যে পুলিশ শালারা
গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে না। দেরি করে, গাফিলতি করে। দায়িত্বে অবহেলা করে;
তদন্ত রিপোর্টের ওজন থাকে না। কিন্তু চাইলে এগুলো খুব সহজেই করা সম্ভব যদি
সদিচ্ছা থাকে। তো তারা তাদের কাজ করুক বা না করুক অথবা তারা তাদের কাজ,
তাদের কাজ করলো কি, না করলো বা কিভাবে করলো সেটা আমার দেখার বিষয় না। সেটা
রাষ্ট্রের ব্যাপার।
আমি একটা ঘুম দিলাম। প্রশান্তির একটা ঘুম। ঘুম
ভাঙলো সন্ধ্যার দিকে। কম্পিউটারটা অন করে Facebook অন করলাম।স্ক্রল করতে
থাকলাম। অবশেষে কাঙ্ক্ষিত নিউজটা পেলাম।
নিউজটা হলো এই যে,
ওই ধর্ষণ মামলার এজাহারে যে আসামিদের নাম ছিল তাদের প্রত্যেককেই হত্যা করা
হয়েছে। লাশ ছিন্নভিন্ন করে দেশের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে দেওয়া
হয়েছে ।
আমি মনে মনে বললাম। Justice has, at long last, been duly administered.
নিউজটা দেখে আমার মুখে একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠলো।
তারপর মনে হলো, নওরিনের সাথে গত দুদিন কথা হয়নি। কি করছে মেয়েটা? কি ভাবছে, কি জানি?
বেশ কয়েকটা কল মিসড হয়ে গিয়েছে তা আমি দেখছি।
তো, আমার নওরিনের সাথে দেখা করতে ইচ্ছা করলো। তাই, ওকে ফোন করলাম।ও বললো, হাসপাতালে আসতে ওর ডিউটি আছে।
ফেসবুকের ওই নিউজটা দেখে আমি আর স্ক্রল করলাম না। কম্পিউটারের ব্রাইটনেসটা একদম কমিয়ে দিয়ে হেলান দিয়ে বসলাম। পর্দার নীলচে আলোতে আমার রুমের অন্ধকারটা আরও ঘনীভূত হয়ে উঠল। সংবাদে বলা হয়েছে, লাশগুলো এমনভাবে ছিন্নভিন্ন করা হয়েছে যে সনাক্ত করতেও পুলিশের বেগ পেতে হচ্ছে। একেকটা অংশ পাওয়া গেছে একেক জেলায়। মানুষ এটাকে 'ঐশ্বরিক বিচার' বলছে, পুলিশ বলছে 'গ্যাং ওয়ার'। আমি শুধু ভাবলাম, কাজের মান যাই হোক না কেন, ডেলিভারিটা বেশ দ্রুত হয়েছে।
পার্কিং লটের সেই সাদা গাড়িটা নিয়ে আমার যে সন্দেহ ছিল, সেটা এখন একটা নিছক হাস্যকর স্মৃতি মনে হচ্ছে। ওটা শহীদুলের কোনো নজরদারি ছিল না, বরং আমার ওপরতলার এক নতুন ভাড়াটিয়ার গাড়ি। লোকটা এনএসআই (NSI) এর কোনো এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। এই বিল্ডিংয়ে তার থাকাটা যেমন স্বাভাবিক, আমার সন্দেহ করাটাও তেমন স্বাভাবিক ছিল। আসলে এই লাইনে থাকলে নিজের ছায়াটাকেও মাঝে মাঝে শত্রু মনে হয়।
মুঠোফোনটা হাতে নিলাম। নওরীনের সাতটা মিসড কল। মেয়েটা আমাকে নিয়ে ঠিক কতটা দুশ্চিন্তা করে জানি না, তবে তার এই নিয়মিত খোঁজ নেওয়াটা আমার কাছে এখন আর বিরক্তিকর লাগে না। বরং এই অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতায় নওরীনের অস্থিরতাটুকুই আমাকে বাস্তবের সাথে জুড়ে রাখে।
আমি কল ব্যাক করলাম না। বদলে একটা ছোট মেসেজ দিলাম— “ঘুমিয়েছিলাম। আজ রাতে দেখা হতে পারে।”
আমি জানি উত্তর আসবে না। কারণ এখন নওরীনের রাউন্ডের সময়। আমি আলমারি থেকে একটা ক্লিন শার্ট বের করে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। গত দুদিনের ধকল আমার চোখের নিচে স্থায়ী একটা কালি ফেলে গেছে। কর্দমাক্ত রাস্তা, বৃষ্টির শব্দ আর সেই গা গুলিয়ে আসা রক্তের গন্ধ... এগুলোর কথা মনে হচ্ছিল।
রুমের ভেতর এসিটা আবার সেই অদ্ভুত 'বিপ' শব্দ করে উঠল। আমি সেদিকে না তাকিয়েই জ্যাকেটটা হাতে নিলাম। আমার এই Musou Black দেওয়ালে এখন আর কোনো ছায়া নড়ছে না। ঘরটা একদম শান্ত। তবে এই শান্তির নিচে যে বিশৃঙ্খলাটা আছে, তা আমি ছাড়া আর কেউ বুঝবে না।
দরজা লক করে নিচে নামতেই দেখলাম কেয়ারটেকার আমার গাড়িটা বেশ যত্ন করে পরিষ্কার করেছে। চাকাগুলোর ফাঁকে জমে থাকা সেই লালচে মাটিগুলো আর নেই। আমি পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে তার হাতে দিলাম। লোকটা হাসিমুখে বলল, “স্যার, গাড়ি তো ঝকঝকে হয়ে গেছে। তবে পেছনের সিটের নিচে একটা অদ্ভুত জিনিস পেয়েছিলাম।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, "কি পেয়েছো?"
সে আমার দিকে একটি রুপোর চেইন হাত বাড়িয়ে ধরলো।
কেয়ারটেকারের বাড়িয়ে ধরা রুপার চেইনটা আমি হাতে নিলাম। লকেটের ওপরের 'E' অক্ষরটা বিকেলের ম্লান আলোয় চিকচিক করছে। আমার মাঝে কোনো চাঞ্চল্য তৈরি হলো না। আমি শুধু লজিক দিয়ে ভাবলাম, নওরীন এ ধরণের সস্তা রুপার চেইন পরে না, তার রুচি বেশ অভিজাত।
আমি চেইনটা পকেটে ঢুকিয়ে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসলাম। স্টার্ট দেওয়ার পর ইঞ্জিনের একটা পরিচিত গর্জন শোনা গেল। স্টিয়ারিং হুইলের গ্রিপটা ধরতেই হাতের তালুতে সেই পরিচিত রুক্ষ অনুভূতি ফিরে এল।
আপনারা হয়তো ভাবছেন একজন সাধারণ ফ্রিল্যান্সারের জীবনে এত রক্ত আর এত শীতলতা কোত্থেকে আসে। আসলে পরিচয়টা যতটা সাধারণ মনে হয়, অতটা না। বাংলাদেশ আর্মির ১ প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়নের সেই দুর্ধর্ষ দিনগুলোর কথা খুব একটা মনে করি না আমি। মেজর এনাম হোসেন হিসেবে কমান্ডো ট্রেনিংয়ের সেই ভয়ংকর দিনগুলো পার করা, কিংবা এসএসজি (SSG)-তে একজন ডেকোরেটেড অফিসার হিসেবে থাকা সবই এখন অতীত। কেন চাকরিটা ছেড়েছিলাম, সেই ডার্ক চ্যাপ্টারটা না হয় তোলাই থাক। তবে মেজরের তকমাটা মুছে ফেললেও কমান্ডো ট্রেনিংয়ের সেই সূক্ষ্মতা আমার রক্তে এখনো মিশে আছে।
গাড়িটা পার্কিং থেকে বের করে আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজের দিকেই মোড় নিলাম। নওরীনের মেসেজটার কথা মনে পড়ল। মেয়েটা আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি যতই নিজেকে রোবট দাবি করি না কেন, নওরীনের এই অস্থিরতাটুকু আমাকে মাঝেমধ্যে কিছুটা মানুষের মতো অনুভব করায়।
হাসপাতালে পৌঁছে গাড়িটা পার্ক করে আমি ক্যাফেটেরিয়ার দিকে এগোলাম। নওরীন এক কোণার টেবিলে বসে আছে। তার সামনে এক কাপ কফি, যেটা থেকে ধোঁয়া ওঠা অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। আমাকে দেখে সে যেন কিছুটা স্বস্তি পেল।
“তুমি আসবে না ভেবেছিলাম,” নওরীন মৃদুস্বরে বলল।
আমি তার মুখোমুখি বসলাম। “বলেছিলাম তো রাতে দেখা হতে পারে। কী খবর তোমার?”
নওরীন সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকাল। তার দৃষ্টি আজ অনেক বেশি গভীর। “এনাম, তুমি জানো ওই ধর্ষণ মামলার আসামিদের কী হয়েছে? খবরটা শুনেছ?”
আমি খুব স্বাভাবিক গলায় উত্তর দিলাম, “হ্যাঁ, ফেসবুকে দেখলাম। বিচার হয়েছে ওদের।”
নওরীন একটু চুপ থাকল। তারপর টেবিলের ওপর দিয়ে ঝুঁকে এসে নিচু গলায় বলল, “মানুষ বলছে এটা কোনো ‘ভুতুড়ে’ কাজ। কিন্তু আমি যখন খবরটা পড়ছিলাম, তখন বারবার তোমার কথা মনে পড়ছিল। এনাম, তুমি কি সত্যি জানো না এটা কে করেছে?”
আমি পকেট থেকে সেই রুপার চেইনটা বের করে টেবিলের ওপর রাখলাম। নওরীনের চোখের মণি স্থির হয়ে গেল।
“এটা চেনো?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
নওরীন চেইনটা হাতে নিয়ে ভালো করে দেখল। তার কপালে ভাঁজ পড়ল। “এটা তো... এটা তো ইরার চেইন হওয়ার কথা নয়। তবে ‘E’ লেখা কেন? আর এটা তুমি কোথায় পেলে?”
“আমার গাড়ির পেছনের সিটে,” আমি শান্ত গলায় বললাম। “ইরার হবে হয়তো, ওর লাশ আসলে আমি আমার গড়িতেই নিয়ে গিয়েছিলাম”
নওরীন আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “এনাম, আমার খুব ভয় হচ্ছে। এই সবকিছুর মাঝখানে তুমি নিজেকে হারিয়ে ফেলবে না তো?”
আমি হালকা হাসলাম। “আমি তো হারিয়েই আছি নওরীন। কুয়াশাচ্ছন্ন জঙ্গলে যারা বাস করে, তাদের হারানোর কোনো জায়গা নেই।”
আমি
কফি অর্ডার করলাম। রাতটা ধীরে ধীরে বাড়ছে। হাসপাতালের এই সাদা করিডোরগুলোর
ওপাশে হাজারো মানুষের জীবন-মৃত্যুর লড়াই চলছে। আর আমি এখানে বসে আছি বেশ
অদ্ভুত একটা পরিবেশ, তাই না?
আরও কিছুক্ষণ নরিনের সাথে কথাবার্তা বলার পর, আমার মনে হলো, এখন মনে হয় আমার ফেরা উচিত।
তো, আমি নওরিনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পার্কিং লটের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম।
তারপর গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমি শহরের ব্যস্ত রাস্তার দিকে গাড়িটা ঘোরালাম। ট্রাফিক জ্যাম, হর্ন আর মানুষের কোলাহল সবকিছুই খুব স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার আড়ালে আমি জানি, জাস্টিস যখন ডেলিভারি হয়, তখন তার একটা রিসিপ্ট কোথাও না কোথাও থেকে যায়।
গাড়ির রিয়ার ভিউ মিররে নিজের চোখের দিকে তাকালাম। একটা শীতল হাসি আমার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল। আমি একজন ফ্রিল্যান্সার। আমি বিচার করি না, আমি শুধু কনট্রাক্ট শেষ করি।
রাস্তা এখন আগের চেয়ে কিছুটা ফাঁকা। সিগন্যালে দাঁড়িয়ে আবার সেই নিউজটার কথা ভাবলাম। নিউজ ফিডে স্ক্রল করার সময় যে ছবিগুলো দেখেছিলাম, সেগুলো সাধারণ কোনো ‘গ্যাং ওয়ার’ বা ‘হত্যাকাণ্ড’-এর মতো ছিল না। একেকটা জেলায় লাশের অংশ খুঁজে পাওয়া মানে হচ্ছে কেউ একজন অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় পুরো ঘটনাটা ঘটিয়েছে এবং তারপর সেগুলোকে ডিসপোজ করার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে।
এদেশে বিচার পাওয়ার আশা যখন ফিকে হয়ে যায়, তখন মানুষ এরকম ‘ভুতুড়ে’ বা ‘ভিনগ্রহের’ জাস্টিস কামনা করে। নওরীন যে ভয়টা পাচ্ছিল, সেটা অমূলক নয়। সে ডাক্তার হওয়ার পথে, সে জানে একটা মানুষের শরীরকে এভাবে বিচ্ছিন্ন করতে কতটা অ্যানাটমিক্যাল নলেজ বা পেশাদারিত্বের প্রয়োজন। ওর সন্দেহটা হয়তো সেখানেই। কিন্তু আমি তো জানি, আমি কেবল আমার কম্পিউটারের সামনে বসে গেম খেলছিলাম, অথবা কর্দমাক্ত রাস্তা দিয়ে ড্রাইভ করে ফিরছিলাম।
গাড়িটা নিজের ফ্ল্যাটের পার্কিংয়ে এনে থামালাম। কেয়ারটেকার লবিতে ঝিমাচ্ছে। আমি নিঃশব্দে লিফটে উঠে নিজের তলায় চলে এলাম।
রুমে ঢুকে ডার্ক রুমের ওলেড প্যানেলটা আবার অন করলাম। নীলচে আলোয় ঘরটা আবছা আলোকিত হলো। ড্রয়ার থেকে সেই রুপার চেইনটা বের করে টেবিলের ওপর রাখলাম। 'E' লকেটটা স্থির হয়ে পড়ে আছে। এটার পেছনে কোনো জাদুকরী রহস্য নেই; হয়তো ইরা এটা তার শখ করে কেনা কোনো গয়না হিসেবেই রেখেছিল, আর সেদিন তার নিথর দেহটা গাড়িতে তোলার সময় ওটা পেছনের সিটের কোণায় আটকে গিয়েছিল।
আমি কম্পিউটারের সামনে বসে আবার সেই নিউজ পোর্টালগুলো ঘাটতে শুরু করলাম। পুলিশ এখনো কোনো কূল-কিনারা করতে পারেনি। কোনো সিসিটিভি ফুটেজ নেই, কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই। যেন অপরাধীরা স্রেফ শূন্যে মিলিয়ে গেছে, অপরাধী ? তাহলে অপরাধের সংজ্ঞাটা আসলে কী? । মানুষ এটাকে ‘ঐশ্বরিক বিচার’ হিসেবে মেনে নিয়ে খুশি হচ্ছে, কিন্তু সিস্টেমের ভেতরের মানুষগুলো বেশ অস্বস্তিতে আছে। তারা জানে, যখন আইনি ব্যবস্থার বাইরে কেউ এভাবে বিচার করতে শুরু করে, তখন সেটা খোদ সিস্টেমের ব্যর্থতাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কফি মেকারটা অন করলাম। নওরীনের সেই প্রশ্নটা কানে বাজছে “এনাম, তুমি কি সত্যি জানো না এটা কে করেছে?”
আমি একটু মুচকে হাসলাম।
একজন ফ্রিল্যান্সারের সবচেয়ে বড় গুণ হলো সে কেবল তার নির্দিষ্ট গণ্ডির ভেতরের কাজটুকু নিয়েই মাথা ঘামায়। এর বাইরে পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলেও তার কিছু যায় আসে না। আমার কাছে ওটা কেবল একটা ফেসবুক নিউজ, আর নওরীনের কাছে ওটা একটা অমীমাংসিত আতঙ্ক।
আমি কফির কাপ হাতে নিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। শীতলক্ষ্যার ওপারের আকাশটা এখন ঘন নীল। ট্রাফিক জ্যাম বা হর্নের শব্দ এখন আর নেই। শহরটা সাময়িকভাবে শান্ত, কিন্তু এই শান্তির নিচে যে রক্ত আর প্রতিহিংসার স্রোত বয়ে গেছে গত দুদিনে, তার রেশ রয়ে গেছে ওই ছিন্নভিন্ন হওয়া লাশগুলোর ভেতরে।
আমি কফিতে একটা বড় চুমুক দিলাম। লজিক্যাল কনক্লুশন আসলে এটাই বিচারের নামে যখন প্রহসন হয়, তখন প্রকৃতি বা অন্য কোনো অদৃশ্য হাত তার নিজস্ব উপায়ে সমতা ফিরিয়ে আনে। আমি বিচারক নই, আমি কোনো রক্ষাকর্তাও নই। আমি কেবল একজন ফ্রিল্যান্সার, যে অন্ধকারের ভেতরে নিজের মতো একটা জগত তৈরি করে নিয়েছে।
পরবর্তী মিশনের কোনো আপডেট এখনো আসেনি। ডেল্টা ফোর্স গেমের ম্যাপটা স্ক্রিনে টিমটিম করছে। আমি আবার কম্পিউটারের সামনে বসলাম। বাইরে পৃথিবীটা যাই হোক না কেন, আমার এই ডার্ক রুমের ভেতরে সবকিছুই খুব নিউট্রাল, খুব স্থির।
চলবে...

0 মন্তব্যসমূহ