ফ্রীল্যান্সার ( পর্ব – 8)


 


হ্যাঁ। আপনাদেরকে তো বলাই হয়নি, নওরিনের সাথে আমার পরিচয় কিভাবে হয়েছিল। সেটা একটা অদ্ভুত ঘটনা। ঠিক ঘটনা না দুর্ঘটনাই বলা চলে। তবে শুনুন, আজকে যেহেতু কোনো কাজ নেই, সেই গল্পটা আপনাদের আজকে বলি। আজকে গেম খেলতে ইচ্ছা করছে না। কাজেই গল্প করেই সময়টা কাটাই। কি বলেন? 

আমাদের পরিচয়টা কোনো কফি শপে বা বৃষ্টির দিনে লাইব্রেরিতে হয়নি। হওয়ার কথাও নয়। আমার মতো মানুষের সাথে কারো পরিচয় হতে গেলে সেখানে রক্তের দাগ কিংবা বারুদের গন্ধ থাকাটাই স্বাভাবিক। ঘটনাটা আজ থেকে বছর দুয়েক আগের। তখন আমি সবেমাত্র আর্মি থেকে বেরিয়েছি। মেজর এনাম হোসেন থেকে কেবল 'এনাম' হওয়ার প্রক্রিয়ায় ছিলাম। মুসো ব্ল্যাক পেইন্ট তখনো আমার দেওয়ালে লাগেনি, কিন্তু মনের দেওয়ালে অন্ধকারটা আগে থেকেই ছিল।

সেদিন রাত ছিল প্রায় আড়াইটা। আমি আমার কালো বিএমডব্লিউ এম-ফাইভ নিয়ে ৩০০ ফিটের খালি রাস্তায় উচ্চগতিতে ড্রাইভ করছিলাম। উদ্দেশ্যহীন ড্রাইভিং আমার পুরনো নেশা। হঠাৎ কুড়িল ফ্লাইওভার থেকে নামার কিছুদূর আগে দেখলাম একটা ধূসর রঙের করোলা গাড়ি রাস্তার পাশে আইল্যান্ডের সাথে ধাক্কা খেয়ে কাত হয়ে আছে। পাশেই দুটো মোটরসাইকেল দাঁড়িয়ে। চার-পাঁচজন ছেলে ওই গাড়ির কাঁচ ভাঙার চেষ্টা করছে। ভেতরে একজন নারী কণ্ঠের আর্তচিৎকার শোনা যাচ্ছিল।

সাধারণত আমি এসব ঝামেলায় জড়াই না। আমার কাছে লজিক খুব পরিষ্কার যার বিপদ সে বুঝবে। কিন্তু সেদিন কেন জানি আমার কমান্ডো ট্রেনিংয়ের সেই অবদমিত 'মাসল মেমোরি' জেগে উঠল। আমি গাড়ির গতি না কমিয়ে সরাসরি একটা ড্রপ-গিয়ার দিয়ে ব্রেকে পা রাখলাম। টায়ারের ঘর্ষণে কান ফাটানো শব্দে রাস্তাটা কেঁপে উঠল। বিএমডব্লিউ-র হেডলাইটের তীব্র সাদা আলোতে ওই হায়নাগুলোর চোখ ধাঁধিয়ে গেল।

গাড়ি থেকে যখন নামলাম, তখনো আমার হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। ওটা ঠোঁটে রেখেই আমি তাদের দিকে এগোলাম। ওদের হাতে ছিল রামদা আর হকিস্টিক। একজন গালি দিয়ে আমার দিকে তেড়ে আসতেই আমি কেবল বাম হাতটা ব্যবহার করলাম। কমান্ডো ব্যাটালিয়নের সেই পরিচিত ‘রিস্ট-লক’ টেকনিক। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লোকটার কবজি ভেঙে তার নিজের ধারালো অস্ত্রটাই তার গলার নিচে ধরলাম।

পরের তিন মিনিট ছিল পিওর ক্লিনিক্যাল অপারেশন। কোনো চিৎকার নেই, কোনো বাড়তি মুভমেন্ট নেই। মাত্র কয়েকটা পাঞ্চ আর প্রেসার পয়েন্টে আঘাত চারজনই রাস্তায় কাতরাচ্ছে। শেষজন ভয়ে বাইক নিয়ে পালিয়ে গেল। আমি সিগারেটে শেষ টান দিয়ে ওটা পায়ের নিচে পিষলাম। এরপর ওই দুমড়ে যাওয়া গাড়ির দিকে তাকালাম।

কাঁচ ভেঙে নওরীন তখন প্রায় অচেতন অবস্থায় স্টিয়ারিংয়ে মাথা ঠেকিয়ে ছিল। তার কপালে কাঁচের টুকরো লেগে রক্ত ঝরছিল। আমি ঠান্ডা মাথায় গাড়ির দরজাটা হ্যাঁচকা টানে খুলে ফেললাম। ও আমার দিকে তাকাল ঝাপসা চোখে শুধু আমার অবয়বটা দেখছিল সে। ওর ঠোঁট কাঁপছিল, কিছু একটা বলতে চাইল কিন্তু পারল না।

আমি ওকে কোলে তুলে নিজের গাড়ির পেছনের সিটে শুইয়ে দিলাম। সে তখনো থরথর করে কাঁপছে। ওটা ছিল ‘ট্রমাটিক শক’। আমি গাড়ি স্টার্ট দিয়ে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের দিকে ছুটলাম। পথে একবারও আমি ওর সাথে কথা বলিনি। ওর কান্নার শব্দ আমার কানে আসছিল, কিন্তু আমি রিয়ার ভিউ মিররে ওর দিকে তাকাইনি। আমার ফোকাস ছিল রাস্তায়।

হাসপাতালে পৌঁছে স্ট্রেচারে ওকে নামিয়ে দেওয়ার সময় সে আমার জ্যাকেটের হাতাটা শক্ত করে ধরল। তার রক্তাক্ত হাত দিয়ে আমার কালো জ্যাকেটে একটা ছাপ পড়ে গেল। নওরীন ফিসফিস করে বলল, “আপনি কে?”

আমি ওর হাতটা ছাড়িয়ে দিয়ে নার্সকে উদ্দেশ্য করে বললাম, “পেশেন্টের কপালে কাঁচের টুকরো আছে, দ্রুত ক্লিন করুন।” নওরীনের প্রশ্নের কোনো উত্তর আমি সেদিন দিইনি। বরং হাসপাতালের বিলটা অগ্রিম পরিশোধ করে দিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে এসেছিলাম।

তার কয়েকদিন পর। আমি তখন বনানীর একটা ক্যাফেতে বসে ল্যাপটপে কাজ করছি। হুট করে সামনে কেউ একজন এসে দাঁড়াল। তাকিয়ে দেখি নওরীন। মাথায় ব্যান্ডেজ, হাতে একটা খাম। মেয়েটা আমাকে খুঁজে বের করেছে আমার গাড়ির নম্বর প্লেটএর মাধ্যমে, মেয়েটা যথেষ্ট চালাক। ওই পরিস্থিতিতেও আমার গাড়ির রেজিষ্ট্রেশন নম্বর সে মনে রেখেছিলো । ওর বাবা রিটায়ার্ড কোনো এক প্রভাবশালী আমলা, তাই আমার ডিটেইলস পাওয়া ওর জন্য খুব কঠিন ছিল না।

সে আমার সামনের চেয়ারে বসে থমথমে গলায় বলল, “আপনি সেদিন উত্তর না দিয়ে চলে গিয়েছিলেন কেন? আর টাকাটাই বা কেন দিয়ে আসলেন?”

আমি ল্যাপটপ থেকে চোখ না তুলেই বললাম, “আমার মনে হয়েছিল ওটাই লজিক্যাল কনক্লুশন। টাকাটা আপনার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ছিল, আর আমার নামটা আপনার জানার দরকার ছিল না।”

নওরীন কিছুক্ষণ চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব শান্ত স্বরে বলল, “আমি ঢাকা মেডিকেলের স্টুডেন্ট। সেদিন আপনার সাহায্য না পেলে আজ আমি ঢাকা মেডিকেলের ক্লাসে থাকার বদলে মর্গে থাকতাম। আমি আপনার এই ঋণ শোধ করতে পারব না, কিন্তু অন্তত আপনাকে কফি তো খাওয়াতে পারি?”

আমি তাকালাম ওর দিকে। নওরীনের চোখের ভেতরে এক ধরণের অদ্ভুত কৌতূহল আর জেদ ছিল। আমি সাধারণত মেয়েদের সাথে সময় কাটাই না, কিন্তু সেদিন কেন জানি 'না' বলতে পারলাম না। সম্ভবত ওর ওই শান্ত অথচ সাহসী দৃষ্টির ভেতরে আমি এমন কিছু দেখেছিলাম যা আমার অন্ধকার জগতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

নওরীন কফির অর্ডার দিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল, “আপনার হাতটা ওভাবে ক্ষতবিক্ষত কেন? আপনি কি মারপিট করতে পছন্দ করেন?”

আমি নিজের হাতের তালুটার দিকে তাকালাম। সেদিন রাতে একজনের দাঁতে লেগে একটা গভীর আঁচড় পড়েছিল। আমি নির্লিপ্ত গলায় বললাম, “আমি মারপিট করি না। আমি জাস্ট সমস্যার সমাধান করি।” 

নওরীন হেসে ফেলল। সেই প্রথম ওর হাসি দেখলাম। বলল, “আপনি একটা অদ্ভুত মানুষ, এনাম সাহেব। আপনার ভেতরে মানুষ আছে নাকি শুধু একটা ক্যালকুলেটর?” আপনাকে ক্যালকুলেটরের সাথে তুলনা করলাম এই কারণে যে, কম্পিউটার বা মোবাইলের প্রসেসিং ক্ষমতার সাথে মনে হচ্ছে না আপনার ব্রেইনের সামঞ্জস্য আছে। আপনার ব্রেইনের সামঞ্জস্য থাকলে থাকতে পারে ক্যালকুলেটরের সাথে। তাই বললাম। 

আমি কোনো উত্তর দিইনি। কিন্তু সেদিন থেকেই আমাদের এই বিচিত্র বন্ধুত্বের শুরু। নওরীন চেষ্টা করে আমার ভেতরে মানুষ খুঁজে পেতে, আর আমি চেষ্টা করি ওকে বোঝাতে যে মানুষ বলে কিছু নেই, শুধু আছে কিছু বায়োলজিক্যাল ফাংশন।

ও ডাক্তার হতে চায় জীবন বাঁচাতে, আর আমি আর্মি ছেড়ে ফ্রিল্যান্সার হয়েছি কারণ আমার কাছে জীবনের চেয়ে মৃত্যুর অঙ্কটা বেশি নির্ভুল মনে হয়। এভাবেই নওরীনের সাদা অ্যাপ্রন আর আমার মুসো ব্ল্যাক রুমের মাঝে একটা ধূসর রেখা তৈরি হয়েছে যেটার নাম হয়তো মায়া, কিংবা নিছক এক অদ্ভুত কৌতূহল।

এখন ভাবছি, সেদিন যদি আমি ৩০০ ফিটের ওই রাস্তায় ড্রাইভ করতে না যেতাম, তবে হয়তো নওরীনের জীবনটা অন্যরকম হতো। আর আমার অন্ধকার রুমটা হয়তো সত্যিই আজ সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ থাকত। কিন্তু নিয়তি তো আর ডেল্টা ফোর্সের প্রোগ্রামিং নয় যে আমি যখন খুশি ডিলিট করে দেব।

ওহ! এর মধ্যে আরও বেশ কিছু বিষয় খোলসা হয়েছে। ওই যে শহিদুল ইসলাম সাহেবের কথা মনে আছে আপনাদের? আমার আর্মির চাকরি ছাড়ার পর একটা মার্সেনারি সংগঠন আমাকে approach করে তাদের সাথে যোগ দেওয়ার জন্য।কিন্তু আমি তাদের সাফ  মানা করে দিই। শহিদুল তাদেরই লোক ছিল। 

আর নওরিনের সাথে আমার সম্পর্কের আসলে কোন সংজ্ঞা নেই। ও কি আমার বন্ধু নাকি প্রেমিকা? না, আসলে কি? ব্যাপারটা একেবারেই অস্পষ্ট। তো, নওরিনের তো বিয়ের বয়স হয়ে গিয়েছে। তাই প্রায়ই তাদের বাড়িতে বিভিন্ন সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকে সম্বন্ধ আসে ওর জন্য। ও প্রত্যেকবারই কোনো না কোনো কারণ দেখিয়ে সম্পর্কগুলো reject করে দেয়। আর আমাকে ফোন করে জানায়। ও যখন এই ব্যাপারগুলো নিয়ে আমাকে ফোন করে, তখন ওর কণ্ঠের মধ্যে অদ্ভুত একটা আকুতি কাজ করে। আমি আবেগীন মানুষ। আমি এসব বুঝি না।

Delta Force গেমটা খেলছিলাম। খুবই tough একটা situation এ গেমটা রয়েছে তখন। মানে একেবারে হার-জিতের মাঝামাঝি অংশে। ঠিক এই সময়ে হঠাৎ নওরিনের ফোন। আমি রিসিভ  করলাম। আর ফোনে কথা বলতে গিয়ে ওই season টাতে আমি হেরে গেলাম।

স্ক্রিনে লাল রঙে বড় করে লেখা উঠেছে MISSION FAILED

ডেল্টা ফোর্সের সেই বিশেষ মিশনে আমি গত দেড় ঘণ্টা ধরে আটকে ছিলাম। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মতো অবস্থা যখন, ঠিক তখনই নওরীনের ফোনটা এসেছিলো। মাউসের গ্রিপটা আলগা হয়ে গেল, আমার সাইলেন্ট মুভমেন্ট ধরা পড়ে গেল এনিমি র‍্যাডারে। স্ক্রিনের পিক্সেলগুলো যখন আমার পরাজয় ঘোষণা করছে, আমার কানে তখন নওরীনের ভাঙা কণ্ঠস্বর বাজছে।

আমি মাউসটা ছেড়ে দিয়ে চেয়ারে হেলান দিলাম। ওলেড প্যানেলের নীলচে আলোয় আমার হাতের তালুটা কেমন ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। নওরীনের কথায় যে ভয়ের কম্পন ছিল, সেটা সাধারণ কোনো ভয়ের চেয়েও বেশি। এটা ছিল সেই ধরণের আতঙ্ক যা মানুষ অনুভব করে যখন সে বুঝতে পারে আইন, সমাজ কিংবা নীতি কোনো কিছু দিয়েই সে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে না।

তো ফোন আলাপের সারাংশ হলো এই যে: 

আবার একটা প্রস্তাব এসেছে। কিন্তু এবার একটা ঝামেলা বেঁধেছে। প্রস্তাবটা এসেছিল এক রাজনৈতিক নেতার ছেলের কাছ থেকে। 

ছেলের বাবা মানে ওই রাজনৈতিক নেতা আমার ভাষায় একটা ”পাকা শুয়োর।” আর ওর ছেলে, মানে শুয়োরের বাচ্চাটা। একটা নেশাখোর,মাগীবাজ, দুশ্চরিত্র, কুলাঙ্গার আর কি। ওই যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল মাঝে মাঝে রাজপথে নেমে কুত্তার মতো কামড়াকামড়ি করে না? ওই কামড়াকামড়ি করতে গিয়ে ওই শুয়োরের বাচ্চার দলের কেউ আহত হয়। তো, তাকে treatment করাতে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আর সেখানেই কোনোভাবে এই শুয়োরের বাচ্চাটা নওরিনকে দেখে এবং তার পছন্দ হয়। এবং বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়।

তো তখন ও আমাকে বলল, এনাম তুমি বিষয়টাকে যতটা স্বাভাবিক ভাবছ, বিষয়টা ততটা স্বাভাবিক না।ছেলের পরিবার বাসায় দলবল নিয়ে এসে একপ্রকার শক্তি প্রদর্শন করে গিয়েছে।

আর আমি জানি যে তোমার প্রতি আমার যে feelings, সেটা বোঝার জন্য তুমি যথেষ্ট matured।এবং তুমি সেটা বুঝো। 

কথাটা নওরিন ঠিকই বলেছে, সেটা আমি বুঝি। কিন্তু আমি আবেগ অনুভূতিহীন মানুষ। আমার কাছে এটার কোনো গুরুত্ব নেই। কিন্তু আসলেই কি কোনো গুরুত্ব নেই? যাক সে কথা। 

আমি নওরীনের সাথে কথা শেষ করে ফোনটা টেবিলের ওপর রাখলাম। রুমে পিনপতন নীরবতা। শুধু এসির মৃদু গুঞ্জন আর আমার নিঃশ্বাসের শব্দ। ওই যে রাজনৈতিক নেতার কথা ও বলল, আমি তার প্রোফাইলটা মনে করার চেষ্টা করলাম। ক্ষমতার দাপটে অন্ধ এই লোকগুলো মনে করে পুরো দেশটাই তাদের বাপের জমিদারী। আর তার কুলাঙ্গার ছেলেটা? সে কেবল এক ধরণের বায়োলজিক্যাল আবর্জনা, যার অস্তিত্ব টিকে আছে কেবল তার বাবার ক্ষমতার ছত্রছায়ায়।

আমার কাছে সমীকরণটা খুব সহজ ছিল:

১. নওরীন বিপদে আছে।

২. বিপদের উৎস একটি ক্ষমতাবান রাজনৈতিক পরিবার।

৩. তারা নওরীনের বাসায় গিয়ে শক্তি প্রদর্শন করেছে।

লজিক্যালি চিন্তা করলে, এখানে নওরীনের কোনো দোষ নেই। তার অপরাধ কেবল সে সুন্দরী এবং একজন মেধাবী ডাক্তার। কিন্তু আমাদের এই তথাকথিত সভ্য সমাজে সৌন্দর্য আর মেধা প্রায়ই অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায় যদি না আপনার হাতে লাঠি থাকে। আমার ডার্ক রুমের দেওয়ালে যে মুসো ব্ল্যাক পেইন্ট আছে, সেটা যেমন আলো গিলে নেয়, এই ধরণের মানুষগুলো ঠিক তেমনই সাধারণ মানুষের স্বপ্ন আর নিরাপত্তা গিলে নেয়।

মেজর এনাম হোসেন হিসেবে আমি যখন আর্মি ইন্টেলিজেন্সে (ডি.জি.এফ.আই) কাজ করতাম, তখন এই ধরণের ‘শুয়োর’দের অনেক ফাইল আমার হাতে আসত। তাদের ব্যাংক ব্যালেন্স থেকে শুরু করে কার কতজন রক্ষিতা আছে সবই ছিল আমার নখদর্পণে। কিন্তু এখন আমি সেই পোশাকে নেই। আমি একজন ফ্রিল্যান্সার। আমার কোনো চেইন অফ কমান্ড নেই, কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। শহীদুল ইসলামরা আমাকে মার্সেনারি হিসেবে চেয়েছিল কারণ তারা জানত আমি কতটা নিখুঁতভাবে ‘টার্গেট এলিমিনেট’ করতে পারি। আমি তাদের প্রস্তাবে রাজি হইনি ঠিকই, কিন্তু আজ মনে হচ্ছে আমার ভেতরের সেই কমান্ডো সত্তাটাকে আবার একটু সজাগ করার সময় এসেছে।

নওরীন বলল যে আমি ম্যাচুউর্ড। সে ঠিকই বলেছে। আমি জানি সে আমাকে ভালোবাসে। সে চায় আমি যেন এই পরিস্থিতির হাল ধরি। কিন্তু আমি তো আবেগহীন। আমি কি নওরীনের জন্য এটা করছি? নাকি কেবল আমার ডেল্টা ফোর্স গেমটা নষ্ট করার প্রতিশোধ নিতে? নাকি সেই পুরনো লজিক্যাল কনক্লুশন যেখানে অপরাধীর শাস্তি হওয়াটাই একমাত্র সঠিক গাণিতিক ফলাফল?

আমি ডার্ক রুমের ড্রয়ার থেকে আমার সেই বিশেষ ল্যাপটপটা বের করলাম। এটা ইন্টারনেটের সাধারণ সারফেসের সাথে কানেক্টেড নয়। ডার্ক ওয়েবের কিছু প্রাইভেট সার্ভার ব্যবহার করে আমি ওই রাজনৈতিক নেতার পুরো নেটওয়ার্কটা স্ক্যান করতে শুরু করলাম।

সেদিন রাতে আমি আর গেম খেলিনি।

আমার ওলেড প্যানেলে এখন ডেল্টা ফোর্সের ম্যাপ নেই। সেখানে এখন ভেসে উঠছে ওই নেতার ধানমন্ডির বাসার নকশা, তার ছেলের যাতায়াতের রাস্তা আর তাদের আয়ের অবৈধ উৎসগুলোর তালিকা।

আমি কম্পিউটারের সামনে বসে ভাবছিলাম, নওরীন হয়তো এখন তার হাসপাতালের হোস্টেলে বসে কাঁদছে কিংবা ভয়ে সিঁটিয়ে আছে। সে হয়তো ভাবছে এনাম কি আদৌ কিছু করবে? 

আমি একবার ভাবরাম, আমি কি ফোন করে বলব, "ভয় পেও না, আমি আছি"? না, আমি ওসব বলব না। ওসব বাংলা সিনেমার সংলাপ আমার মুখে মানায় না। আমি কেবল কাজ শেষ করে রিপোর্ট দেব। এটাই একজন ফ্রিল্যান্সারের ধর্ম।

রাত ০৪:১২ মিনিট।

আমি আমার কালো বিএমডব্লিউ-র চাবিটা হাতে নিলাম। মুসো ব্ল্যাক রুমের দরজাটা লক করার সময় আমার মনে হলো, ওই যে ছেলেটা শুয়োরের বাচ্চাটা সে হয়তো এখন কোনো ক্লাবে বসে মদ্যপান করছে আর ভাবছে নওরীনকে সে কীভাবে তার ক্ষমতার জোরে করায়ত্ত করবে। সে জানে না, তার এই চিন্তাটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় ‘স্ট্যাটিসটিকাল এরর’।

আমি যখন নিচে নামলাম, কেয়ারটেকার ঘুমিয়ে কাদা। পার্কিং লটের সাইলেন্স ভেঙে বিএমডব্লিউ-র ইঞ্জিনটা যখন গর্জন করে উঠল, তখন আমার মনে হলো একটা নতুন মিশন লোড হচ্ছে। এই মিশনে কোনো রিস্পন পয়েন্ট নেই। একবার ভুল মানেই সব শেষ। কিন্তু আমার ডিকশনারিতে ‘ভুল’ বলে কোনো শব্দ মেজর এনাম কোনোদিন শেখেনি।

গাড়িটা নিয়ে আমি যখন গেট দিয়ে বের হচ্ছি, হঠাৎ রিয়ার ভিউ মিররে দেখলাম সেই রূপোর চেইনটা ড্যাশবোর্ডের ওপর নড়ছে। 'E' লকেটটা যেন অন্ধকারেও চিকচিক করছে। ইরার সেই নিথর দেহ, নওরীনের আর্তনাদ আর এই রাজনৈতিক দাপট সবই যেন এক সুতোয় গেঁথে যাচ্ছে।

শহরটা এখন নিঝুম। কুয়াশা নেই, কিন্তু ভোরের আলো ফোটার আগে যে ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকে, রাস্তাটা এখন সেই অন্ধকারে ডুবে আছে। আমি এক্সিলারেটরে চাপ দিলাম। সুঁইটা ১০০ ছাড়িয়ে ১২০-এর দিকে যাচ্ছে। আমার টার্গেট ফিক্সড। জাস্টিস যখন আইনি পথে ব্যর্থ হয়, তখন সেটাকে আমার মতো ফ্রিল্যান্সারের ‘শ্যাডো জাস্টিস’ দিয়েই সম্পন্ন করতে হয়।

নওরীনকে বাঁচাতে আসিনি আমি। আমি এসেছি সিস্টেমের এই নোংরা ময়লাগুলো সাফ করতে। এটাই আমার লজিক্যাল কনক্লুশন।

তো আমি শুয়োরের বাচ্চাটার বাসার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

গাড়িটা বাসা থেকে কিছুটা দূরেই রাখলাম।
আমার সেকেন্ডারি মোবাইলটাতে আমি পশুটার মোবাইল "ট্র্যাক"-এ রেখেছিলাম। কোথাও গিয়েছিল হয়তো। এখন বাড়ির দিকেই ফিরছে। 

আমি ওর বাড়ির গেটের সামনে যাব না। সেখানে নিশ্চয়ই CCTV ক্যামেরা থাকবে। 

আমি গাড়ি থেকে নামলাম না। বিএমডব্লিউ-র সাইলেন্সড কেবিনের ভেতরে বসে আমার হাতের গ্লাভসটা অ্যাডজাস্ট করে নিলাম। রাত এখন প্রায় সাড়ে চারটা। ধানমন্ডির এই নিরিবিলি রাস্তায় এখন আবছা কুয়াশা জমেছে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো সেই কুয়াশায় মিশে একটা অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে, কিন্তু এই পরিবেশের পেছনে যে জানোয়ারটা লুকিয়ে আছে, তার জন্য কোনো মায়া আমার নেই।

আমার সেকেন্ডারি ফোনের স্ক্রিনে লাল বিন্দুটা নড়ছে। টার্গেট এখন মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে। গাড়ির হেডলাইট নিভিয়ে আমি সিটের পেছনে হেলান দিয়ে বসলাম। অন্ধকারের সাথে মিশে যাওয়াটা আমার পুরনো অভ্যাস। মেজর এনাম থাকাকালীন সময়ে আমি শিখেছিলাম, শিকারি যখন শিকারের জন্য অপেক্ষা করে, তখন তাকে পাথরের মতো স্থির হতে হয়।

হঠাৎ ইঞ্জিনের গম্ভীর একটা শব্দ ভেসে এল। সাধারণ কোনো গাড়ি নয়, সম্ভবত টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার। টার্গেট আসছে। আমি ড্যাশবোর্ড থেকে আমার নাইট ভিশন মনোকুলারটা তুলে নিলাম। বাড়ির গেটের ৫০০ গজ দূরে একটা বাঁক আছে, যেখানে রাস্তার ধারের বড় বড় গাছগুলোর কারণে সিসিটিভির ভিউ ব্লক হয়ে যায়। ওটাই আমার ‘কিলিং জোন’ তবে আজ আমি কোনো প্রাণ নিতে আসিনি, আজ আমি নিতে এসেছি তার দম্ভ। আমি তাকে এটা বুঝিয়ে দিতে এসেছি যে তাকেও হিট করা যায়। 

গাড়িটা যখন সেই বাঁকে এল, আমি নিঃশব্দে আমার গাড়িটা রাস্তার মাঝখানে আড়াআড়িভাবে এনে দাঁড় করালাম। ঠিক যেন একটা টেকনিক্যাল ব্লকেজ। ল্যান্ড ক্রুজারটা সজোরে ব্রেক কষল। টায়ারের ঘর্ষণে রাতের নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে গেল।

গাড়ি থেকে নামল তিনজন। চালকের আসনে একজন বডিগার্ড, পাশে আরেকজন, আর পেছনের সিট থেকে নামল সেই ‘শুয়োরের বাচ্চাটা’ আরিফ। ওর পরনে দামী ব্র্যান্ডের শার্ট, চোখে নেশার ঘোর স্পষ্ট।

“এই শালা! গাড়ি সরা!” আরিফ চিৎকার করে উঠল। তার গলায় ক্ষমতার সেই কর্কশ দম্ভ।

আমি গাড়ি থেকে নামলাম। খুব ধীরে। আমার হাতে কোনো অস্ত্র নেই, অন্তত দৃশ্যত কোনো অস্ত্র নেই। আমি ওর দিকে এগিয়ে গেলাম। আরিফের দুই বডিগার্ড কোমর থেকে পিস্তল বের করার চেষ্টা করল। কিন্তু তাদের হাত কোমরে পৌঁছানোর আগেই আমি আমার প্রথম মুভটা করলাম।

কমান্ডো ব্যাটালিয়নের সেই ‘নিউট্রালাইজিং স্ট্রাইক’। আমার ডান হাতের তালু গিয়ে লাগল প্রথম বডিগার্ডের থুতনির নিচে, আর বাম কনুই দিয়ে দ্বিতীয়জনের সোলার প্লেক্সাসে একটা নিখুঁত আঘাত। চার সেকেন্ড। দুজনই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল শ্বাস নেওয়ার জন্য তাদের ফুসফুস তখন লড়াই করছে। তারা মরেনি, কিন্তু আগামী আধা ঘণ্টা তাদের নড়ার ক্ষমতা থাকবে না।

আরিফ থমকে গেল। ওর নেশা এক সেকেন্ডে কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। ও পেছনের দিকে সরতে চাইল, কিন্তু আমি ওর কলার ধরে ল্যান্ড ক্রুজারের বডিটার সাথে চেপে ধরলাম।

ওর চোখের মণি তখন ভয়ে কাঁপছে। “আপনি কে? কী চান আপনি?”

আমি ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে গেলাম। আমার কণ্ঠস্বর ছিল একেবারে শান্ত, নিচু লয়ের যেন আমি কোনো লজিক্যাল থিওরি ব্যাখ্যা করছি।

“আরিফ, তোমার বাবার ক্ষমতার সীমানা কতটুকু আমি জানি। কিন্তু আমার গেমের সীমানাটা তুমি জানো না। নওরীন কোনো প্রজেক্ট নয় যে তুমি পলিটিক্যাল পাওয়ার দিয়ে সেটা ‘উইন’ করবে। ওটা একটা গাণিতিক সমীকরণ, যেটার উত্তর তোমার জানা নেই।”

আমি ওর পকেট থেকে দামী আইফোনটা বের করে নিলাম। তারপর আমার ফোন থেকে একটা ফোল্ডার ওর হোয়াটসঅ্যাপে সেন্ড করলাম। ওই ফোল্ডারে ছিল গত তিন বছরে ওর করা সমস্ত অবৈধ কাজ, ড্রাগ ডিলিং আর তার বাবার দুর্নীতির কিছু ‘আনপাবলিশড’ ডেটা—যা আমি ডার্ক ওয়েব থেকে গত রাতে তুলে এনেছি।

“এই ফাইলগুলো যদি ওপেন হয়, তবে তোমার বাবা কেবল নির্বাচন হারাবে না, তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ডিলিট বাটনটা চাপ লেগে যাবে। আর মজার ব্যাপার কী জানো? এই ফাইলগুলো প্রতি ২৪ ঘণ্টা অন্তর অটো-আপলোড মোডে আছে। আমি যদি সুস্থ থাকি এবং আমার ইন্টারনেটে কানেকশন থাকে, তবেই এগুলো ডিলিট হবে না। তার মানে, আমার কিছু হওয়া মানেই তোমাদের ধ্বংস।”

আরিফের কপাল দিয়ে ঘাম ঝরছে। সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু ভয়ে তার জিভ শুকিয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেছে।

আমি ওর কলারটা ছেড়ে দিলাম। তারপর নিচু হয়ে ওর কানে আবার বললাম, “নওরীনের ছায়া থেকে দশ ফিট দূরে থাকবে। এমনকি ওর নামটা যদি তোমার মগজেও কোনোদিন আসে, তবে মনে রাখবে বিএমডব্লিউ-র হেডলাইট তোমার ঘরের জানালায় আবার জ্বলবে। আর সেদিন আমি শুধু ডেটা নিয়ে আসব না।”

আমি নিজের গাড়িতে ফিরে এলাম। গাড়ি রিভার্স করে রাস্তাটা ক্লিয়ার করে দিলাম। আরিফ তখনো সেই ভাঙা মূর্তিটার মতো ল্যান্ড ক্রুজারের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওর সাঙ্গপাঙ্গরা তখনো রাস্তায় কুঁকড়ে পড়ে আছে।

বিএমডব্লিউ-র মিউজিক সিস্টেমে খুব মৃদু একটা ক্লাসিক্যাল টিউন বাজতে শুরু করল। আয়নায় দেখলাম আরিফের গাড়িটা নড়ছে না। ওর ক্ষমতার যে ইমারতটা ও বানিয়েছিল, সেটার একটা ইট আমি সরিয়ে দিয়েছি। এখন পুরো ইমারতটা ধসে পড়ার ভয়ে ও নিজে থেকেই নওরীনের থেকে দূরে থাকবে।

ফিরে আসার পথে আমি নওরীনকে একটা মেসেজ করলাম। কোনো ইমোশন নেই, কোনো আশ্বাস নেই।

মেসেজটা ছিল: “Mission reloaded. Tomorrow’s duty will be peaceful. Sleep well.”

সকাল ৫:৪৫। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। আমি আমার মুসো ব্ল্যাক রুমের দরজাটা খুললাম। ঘরের ভেতরে এসিটা তখনো সেই মৃদু ‘বিপ’ শব্দ করছে। আমি ল্যাপটপটা অন করে আরিফের বাবার নেটওয়ার্কের ওপর একটা ‘পার্মানেন্টলি ওয়াচিং’ অ্যালগরিদম সেট করে দিলাম।

আমি সোফায় হেলান দিয়ে বসলাম। ডেল্টা ফোর্স গেমটার সেই ‘মিসন ফেইল্ড’ লেখা স্ক্রিনটা তখনো সেভাবেই আছে। আমি মাউসটা হাত দিয়ে রিট্রাই বাটনটা চাপলাম।

ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড আর রিয়েল লাইফ দুটো গেমই এখন আমার নিয়ন্ত্রণে। নওরীন কাল সকালে এসে হয়তো অনেক প্রশ্ন করবে। আমি হয়তো আগের মতোই বলব, “আমি বাউনীয়া গিয়েছিলাম বিমানের ছবি তুলতে।” ও বিশ্বাস করবে না, কিন্তু তর্কও করবে না। কারণ ও জানে, আমি এমন এক ক্যালকুলেটর, যার রেজাল্ট সবসময় সঠিক হয়।

আমি চোখ বুজলাম। প্রশান্তির একটা ঘুম দরকার।

তো, আমি একটানা বারো ঘন্টা ঘুমালাম। আমার ঘুম এরকমই। আমি যখন ঘুমাই, তখন স্বপ্ন দেখি। আমি অধিকাংশ সময়ই লুসিড ড্রিমিং করি। এটা আমার ভালো লাগে। কিন্তু কিছু কিছু সময়ে স্বপ্ন তো স-সম্পূর্ণ নিজে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। Lucid Dream সম্পর্কে আপনাদের কোনো অভিজ্ঞতা আছে? কারো কারো নাও থাকতে পারে। তাদের উদ্দেশ্যে জানিয়ে দিই, এটা স্বপ্ন দেখার সময় এমন একটা stage যে, যখন আপনি বুঝতে পারেন যে আপনি স্বপ্ন দেখছেন এবং আপনার স্বপ্নে যে ঘটনাগুলো ঘটছে, সেগুলোকে আপনি তখন নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন। এটা সবাই করতে পারে। কিন্তু অতিরিক্ত excitement-এর জন্য অধিকাংশ সময় স্বপ্ন ভেঙে যায়, ঘুম ভেঙে যায়। ফলাফল এটাই হয়। 

তো সকালে উঠে আমি কফি মেকারটা অন করে কফি বানাচ্ছি। এমন সময় calling bell বেজে উঠলো। আমি ভাবলাম, এই সময় আবার কে? আর সাধারণত আমি তো ভোরবেলায় উঠি না ঘুম থেকে। আজকেরটা এক্সেপশনাল। তারপর আবার সেই "নক নক নক" ধৈর্য নেই একেবারেই শব্দ শুনেই বুঝতে পারলাম, নওরিন এসেছে। 

এক কাঁধে এপ্রোন। অন্য হাতে মোবাইল। বিদ্ধস্ত চেহারা। মানে, সারারাত নাইট ডিউটি করেছে এবং সেখান থেকেই সরাসরি আমার বাসায় এসেছে। আমি ওকে "কফি খাবে?" 

জিজ্ঞেস করলাম। সে উত্তর দিল, "হ্যাঁ, বানাচ্ছো যখন বানাও আমার জন্যও একটা এক কাপ।" 

আমি জিজ্ঞেস করলাম, এত সকাল সকাল আমার বাসায় হানা দেওয়ার কারণ কি? 

নাওরিন কিছুটা চোখ ছোট করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, 

"গতকালকের আগের রাত্রে তুমি কোথায় ছিলে এবং কি করছিলে?"

আমিই বললাম, তুমি তো জানোই আমার অভ্যাস গেম খেলা। Gaming-ই করেছি সারারাত।  কেন ?

নওরীন বলল, "আরিফ এসেছিল আমার হাসপাতালে। বেশ ভদ্রভাবেই আমাকে বলল যে আপনাকে পছন্দ হয়েছিল, তাই বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। আপনি প্রস্তাবটা গ্রহণ করবেন কি করবেন না, সেটা সম্পূর্ণ আপনার উপর নির্ভর করছে। আর আমরা হয়তো সেদিন একটু বেশি করে ফেলেছিলাম। কারণ, আসলে রাজনীতি কি করি তো? লোকজনের প্রতিনিধি, জনগণের প্রতিনিধি। ওরা এরকম করে ফেলে। ওগুলো মানে, ওগুলো ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। 

তারপর আমাকে বলল, "এনাম, তুমি খুব ভালো করেই জানো যে আরিফ তার বাবার সাথেও এত ভদ্রভাবে কথা বলে না।" 

আমি এখানেও তোমার ছায়া দেখতে পাচ্ছি। 

আমি নওরিনকে কফির মগটা দিতে, দিতে বললাম। 

তোমার আসলে গোয়েন্দা হওয়া উচিত, ডাক্তার না। তুমি সবকিছুতেই সন্দেহ করে বসো, ভদ্র ব্যবহার করেছে তো করেছে। সেটা কি স্বাভাবিক নয়? 

নওরিন উত্তর দিল, "না, স্বাভাবিক নয়।" 

ওটা একটা পশু। ওর কাছ থেকে মানুষের মতো আচরণ পাওয়াটা খুবই অস্বাভাবিক একটা বিষয়।

তুমি আমার কাছ থেকে কি লুকাচ্ছ? 

আমি চুপ করে থাকলাম। এবার কোনো উত্তর দিলাম না। একটা সিগারেট ধরলাম। 

নওরিন বলল, "তোমার এই চুপ করে থাকার অভ্যাসটাই আমার কাছে অসহ্য লাগে। আমি এখন চলে যাচ্ছি। তবে এর উত্তর আমি বের করবই তোমার কাছ থেকে।" 

তারপর তিন দিন নওরিনের সাথে কোনো কথাবার্তা হয়নি। আমি আমার কাজে ব্যস্ত ছিলাম, নওরিন তার ডিউটিতে। 

তো তিন দিন পর নাইট ডিউটিতে জয়েন করার সময় হঠাৎ নওরিনের চোখ পড়ে ওই দিনকার পত্রিকাটার উপর।  পত্রিকার হেডলাইন পড়ে নওরিন ডিউটি ছেড়ে সরাসরি আমার ফ্ল্যাটে আসলো। আমি তখন গেম খেলায় ব্যস্ত ছিলাম। 

তো রুমে আসার পর ও বসলো আমার বিছানায়, আর আমি আমার কম্পিউটারের চেয়ারে। চেয়ারটা ঘোরানো যায়। মানে, তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘোরে আরকি। মাঝখান থেকে আমার গেম খেলাটা মাথায় উঠলো। তো আমি জিজ্ঞেস করলাম, হঠাৎ এত রাতে কি হয়েছে, ডাক্তার সাহেব, যে আপনাকে স্টেথেস্কোপ সহ আমার কাছে চলে আসতে হলো? 

নওরিন দৃষ্টি বেশ তীক্ষ্ণ করে আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, "তুমি কে আসলে? তুমি কি?" 

আমি বললাম কেন? 

নওরিন আমার সামনে পত্রিকাটা  রাখলো আর বললো পড়। 

হেডলাইনটা আমি দেখলাম। আরিফ আর তার রাজনৈতিক নেতা বাবা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন একটি ট্রাকের অ্যাক্সিডেন্টে। ঠিক অ্যাক্সিডেন্ট নয়। যেন বারংবার রাস্তার সাইডের গার্ডরেইলের সাথে বারবার হ্যামারিং করেছে ট্রাক দিয়ে ওদের গাড়িটাকে। একেবারে থেতলে গিয়েছে বাপ-বেটা। তবে ট্রাক এবং ট্রাকচালক কাউকেই পাওয়া যায়নি। আর ঘটনাটা হাইওয়েতে হওয়ায় সেখানে কোন CCTV footage পাওয়ার সম্ভাবনাও ছিল না। আর তাজ্জবভাবে পুলিশ Headquarter-এ আরিফ ও তার বাবার যে Underworld-এর বিশেষ কৃতিত্ব সমৃদ্ধ fileটা পৌঁছে গেছে। এবং সেটা নিয়ে একটা প্রেস ব্রিফিং হয়েছে, তার একটা ছবি প্রথম পাতায়। 

তো আমি বললাম, ভালোই তো হয়েছে। সমস্যা নিজে থেকেই সমাধান হয়ে গেছে। তুমি রেগে আছো কেন? 

নওরিন উত্তর দিল, 

"আমি রেগে নেই। আমি আসলে খুব confused তোমাকে নিয়ে।" 

আমি বললাম, "Confusion এর কি আছে?" এখনই আমাকে জিজ্ঞেস করো, আমি উত্তর দিচ্ছি। 

নাওরিন উত্তর দিল, “এতটা সহজ হলে তো ভালোই হতো।” আর বলল, "এই তিন দিন তুমি কি নিয়ে ব্যাস্ত ছিলে? আমাকে তো একটা ফোনও করোনি।" 

আমি বললাম, তুমি কখনো দেখেছো যে আমি কোনো কারণ ছাড়া তোমাকে কল করেছি? 

নওরিন বলল, "কথা ঘোরাবে না। তুমি কিন্তু কথা ঘোরাচ্ছ।" 

আমি বললাম, আমি কথা ঘোরাচ্ছি না। আমি just যুক্তিসঙ্গত উত্তর দিচ্ছি। আমি আমার কাজে ব্যস্ত ছিলাম। আর কোনো কারণ ছাড়া আমি কাউকেই phone করি না। সেটা তুমি ভালো করেই জানো। তাই না? তাহলে এখানে কথা ঘোরানো কোথায় হলো? আর সবকিছুতে তুমি আমাকে সন্দেহ করো কেন ? আমাকে কি তোমার "ক্রিমিনাল" মনে হয় নাকি? 

নওরিন ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল,

"না, criminal মনে হয় না। ভয় হয় তোমাকে নিয়ে। কারণ প্রত্যেকটা অদ্ভুত ঘটনার সাথেই তোমার কেমন যেন একটা কাকতালীয় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংযোগ থাকে। আবার থাকে না। ব্যাপারটা ধোঁয়াশা ময়। এতটাই ধোঁয়াশা যে বোঝা যায় না কিছু।" 

দেখো নাওরীন, আমি একজন ফ্রিল্যান্সার, এবং অতিসাধারণ  এক নাগরিক।

আর তুমি ওভারথিংকার তার ওপর  হাই স্ট্রেস জব করো তো। কাজেই ব্যাপারগুলো তোমার মাথায় অন্যভাবে কাজ করে। তুমি ডাক্তার, তুমি সেটা নিজেই ভালো বুঝবে।আজকেও স্ট্রেসের মধ্যে আছো। চলো, আজকে যাই বাউনিয়াতে। বিমান ওঠা-নামা দেখব। 

গাড়ির চাবিটা হাতে নিয়ে আমি উঠে দাঁড়ালাম। নওরীনের চোখে তখনো একরাশ সংশয় আর ক্লান্তির লড়াই চলছে। আমি জানি, ও যা খুঁজছে তা ও কোনোদিন আমার মুখ থেকে শুনবে না। কারণ সত্য সব সময় সুন্দর হয় না, আর আমার জগতের সত্যগুলো নওরীনের মতো মানুষের জন্য রীতিমতো বিষাক্ত।

আমি পার্কিং লটে নেমে বিএমডব্লিউ-র দরজাটা খুলে ধরলাম। ভোরের হালকা কুয়াশা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। উত্তরা হয়ে বাউনিয়ার সেই নির্জন রাস্তাটার দিকে যখন গাড়িটা ঘোরালাম, তখন ইঞ্জিনের মৃদু গর্জন ছাড়া আমাদের মাঝে আর কোনো শব্দ ছিল না। নওরীন জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। ওর বিধ্বস্ত চেহারায় রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো একটা ছন্দ তৈরি করছিল।

বাউনিয়ার সেই রানওয়ের শেষ সীমানায় গিয়ে আমি গাড়িটা থামালাম। এখান থেকে কুর্মিটোলা বা শাহজালাল বিমানবন্দরের রানওয়েটা খুব কাছে। ঠিক সামনেই একটা বিশাল Airbus A330 নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওটার ল্যান্ডিং গিয়ারের হাইড্রোলিক শব্দ আর ইঞ্জিনের প্রচণ্ড গর্জন যখন আমাদের ওপর দিয়ে বয়ে গেল, তখন মনে হলো পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল ওই শব্দে চাপা পড়ে গেছে।

“আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে চাই এনাম,” নওরীন হঠাৎ নিচু গলায় বলল। ওর কথাগুলো ইঞ্জিনের শব্দের রেশ ধরে বাতাসে ভাসছিল। 

“কিন্তু এই যে তুমি বললে ‘সমস্যা নিজে থেকেই সমাধান হয়ে গেছে’ এই বাক্যটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাইয়ে দেয়। ট্রাকটা যে ওভাবে হ্যামারিং করল, সেটা কোনো সাধারণ অ্যাক্সিডেন্ট ছিল না। ওটা ছিল একটা রুথ লেস কিলিং মেশিন। ঠিক যেমন তুমি ডেল্টা ফোর্সে এনিমি এলিমিনেট করো।”

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। পকেট থেকে সেই লাইটারটা বের করে আগুনের শিখার দিকে তাকালাম। “নওরীন, তুমি ডাক্তার। তুমি জানো, যখন শরীরের কোনো অংশে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ে, তখন কেবল ওষুধে কাজ হয় না। সার্জনকে ছুরি চালাতে হয়। সেই ছুরি চালানোটা কি অপরাধ? নাকি রোগীকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা? আরিফ এবং তার বাবার ওই যে ফাইলটা পুলিশ হেডকোয়ার্টারে পৌঁছেছে, সেটা কি ভালো হয়নি? যে সিস্টেম একদিনে তাদের বিচার করতে পারত না, সেই সিস্টেমই এখন তাদের কুকীর্তি নিয়ে প্রেস ব্রিফিং করছে। লজিক্যালি চিন্তা করলে, এটা সমাজের জন্য একটা বড় লাভ।”

নওরীন আমার দিকে ফিরল। “কিন্তু সেই সার্জনের তো একটা নাম থাকে, একটা লাইসেন্স থাকে। তোমার লাইসেন্সটা কী এনাম? তুমি কি নিজেকে ঈশ্বর ভাবো?”

আমি হাসলাম। তবে সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না। “আমি নিজেকে কিছুই ভাবি না। আমি কেবল একজন ফ্রীল্যন্সার।

আমি নওরীনের দিকে তাকালাম। ও তখন রানওয়ের আলোকসজ্জার দিকে তাকিয়ে শান্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। আমি গাড়ি স্টার্ট দিলাম।

“চলো, তোমাকে হোস্টেলে নামিয়ে দিয়ে আসি। তোমার ঘুম দরকার।

নওরীন আর কোনো প্রশ্ন করল না। হয়তো সে বুঝে গেছে, এই মানুষটার ভেতরে যে দেয়াল আছে, তা ভাঙার মতো কোনো অস্ত্র চিকিৎসা বিজ্ঞানে নেই।

হোস্টেলের গেটে ওকে নামিয়ে দিয়ে আমি যখন আবার ৩০০ ফিটের রাস্তা ধরলাম, তখন রোদ উঠতে শুরু করেছে। ঢাকা শহরটা আবার তার চেনা ব্যস্ততায় ফিরছে। কিন্তু আমার মাথায় তখনো সেই নিউজটার ছবিটা ঘুরছে। 

আমি ফ্ল্যাটে ফিরে এলাম। কেয়ারটেকার গেট খুলে দিয়ে বেশ সমীহের সাথে সালাম দিল। সম্ভবত সকালের পত্রিকায় বড় বড় করে সেই রাজনৈতিক নেতার মৃত্যুর খবর সে-ও দেখেছে। লোকটা খুব খুশি। এই শহরটা বড় বিচিত্র; এখানে মানুষ প্রকাশ্য খুনের চেয়ে গোপন বিচারে বেশি স্বস্তি পায়। 

নওরীন বলেছিল সে কনফিউজড। কিন্তু সে যদি জানতে পারত যে সেদিন রাতে ওই ট্রাকের স্টিয়ারিংয়ের পেছনে থাকা মানুষটার হাত কাঁপে না কেন, তবে তার সেই কনফিউশন আতঙ্কে পরিণত হতো। 

আমি ঘরে ফিরে সরাসরি ওয়াশরুমে চলে গেলাম। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের দিকে তাকালাম। ঠান্ডা পানির ঝাপটা চোখে-মুখে দিতেই একটা অদ্ভুত শীতলতা পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। 

আমি আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকালাম। আমার চোখের মণিগুলো এখনো স্থির, কোনো অনুশোচনা নেই, কোনো উত্তেজনা নেই। ঠিক যেমনটা আমি ট্রেনিংয়ের সময় শিখেছিলাম টার্গেট ইজ জাস্ট এ নাম্বার'। 

আরিফ ও তার বাবার ওই দুর্ঘটনা? ওটা নিয়ে ভাবার এখন আর কোনো যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। জাস্টিস কি আসলেই ডেলিভারি হয়ে গেছে ? হয়নি হয়তো। কারণ আসলেই জাস্টিস ডেলিভারী করতে হলে  ওদের মতো সকল দূর্নীতিবাজদের মোটামুটি একই পরিনতি হতে হবে। তারা যা করতো তা অনুযায়ী actually they don’t deserve to die. 

কিন্তু আরিফ একটা বিশেষ লাইন ক্রস করে ফেলেছিলো। ওর চোখ পড়েছিলো নওরীনের ওপর! আসলে আমার মধ্যে একটা হিংস্র স্বত্বা বসবাস করে। সেটা যখন কারো প্রতি প্রটেক্টিভ মোডে চলে যায় তখন তার সাথে ঘটা প্রতিটা ঘটনা সে ব্যক্তিগত ভাবে নিতে শুরু করে। আর আরিফতো সীমালঙ্ঘন করে নওরীনের বাড়িতে গিয়ে তাকে তার নিজ বাড়িতে তার বাবার সামনে অনিরাপদ বোধ করানোর মতো ভয়াবহ দুঃসাহস করেছিলো। একটা মানুষ নিজেকে কোথায় সবচেয়ে নিরাপদ বোধ করে ? সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ্’র পর হয়তো উত্তরটা হবে নিজ মা-বাবা, নিজ বাড়িতে। কিন্তু সেই নিরাপদ জায়গাটাকে যদি কেউ vulnerable করে তোলার ক্ষমতা প্রদর্শন করে তখন একটা মানুষের কেমন লাগার কথা আপনারাই বলুন? আমার হিংস্র স্বত্বাটা সেটা মেনে নিতে পারেনি।

আপনারা বলতে পারেন তাহলে আমি আরিফকে ক্ষমা চাওয়ালাম কেন?

উত্তরটা সহজ, নওরীনের আগের নিরাপত্তাবোধ টা রিস্টোর করা। (আচ্ছা এটাকি নওরীনের প্রতি ভালোবাসা? নাহ্, আবেগ-অনুভূতিহীন মানুষের মধ্যে ভালোবাসা আসবে কোথা থেকে ?)

তাছাড়া আরিফ ও তার বাবার সাথে জাস্টিস হলো না ইনজাস্টিস হলো সেটা আমার দেখার বিষয় না। আমি ইশ্বর নই। 

আর আরিফ আর ওর বাবার মৃত্যুর পেছনের মেকানিজমটা কী ছিল, কে ওই ট্রাকের পেছনে ছিল, সেগুলো এখন স্রেফ অপ্রাসঙ্গিক ডেটা। পুলিশের ফাইলে ওটা চিরকাল একটা রহস্যময় ‘হিট অ্যান্ড রান’ হিসেবেই পড়ে থাকবে। 

আমি আমার Musou Black রুমে ফিরে এসে ওলেড প্যানেলটা অন করলাম। নীলচে আলোটা আবার ঘরটাকে শাসন করতে শুরু করেছে। তবে এবার আমি কোনো গেম ওপেন করলাম না। তার বদলে আমার পোর্টফোলিও সাইটের কোডগুলো নিয়ে বসলাম। গ্লাস মরফিজম ডিজাইনের ওই ব্লার ইফেক্টগুলো নিয়ে কাজ করতে করতে আমি ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করলাম যে গত কয়েক দিনে কী কী ঘটে গেছে। কোডিংয়ের লজিক আর রিয়েল লাইফের লজিক দুটো যখন মিলে যায়, তখন এক ধরণের পরম শান্তি পাওয়া যায়। 

নওরীনকে হোস্টেলে নামিয়ে দেওয়ার সময় ওর চোখে যে শঙ্কা দেখেছিলাম, সেটা কাটতে সময় লাগবে। ও হয়তো এখনো ভাবছে আরিফ কেন হঠাৎ অতটা ভদ্র হয়ে গেল। কিন্তু আমি জানি, সময়ের সাথে সাথে স্মৃতি ফিকে হয়ে আসে। যখন নতুন কোনো পেশেন্ট আসবে, যখন ও আবার লাইফ-ডেথ সিচুয়েশনে পড়বে, তখন এই ঘটনাগুলো ওর কাছে স্রেফ একটা দুঃস্বপ্ন মনে হবে।

আমি একটা সিগারেট ধরালাম। ধোঁয়াটা ওলেড প্যানেলের আলোর সামনে গিয়ে অদ্ভুত এক আকৃতির সৃষ্টি করছে। আমি কম্পিউটারের ব্রাইটনেসটা কমিয়ে দিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাড়ালাম। বাইরের শহরটা এখন অনেক বেশি সাধারণ। এই সাধারণত্বের নিচেই আমাদের মতো মানুষরা নিজেদের লুকিয়ে রাখে। আমি মেজরের ইউনিফর্মটা ছেড়েছি অনেক আগে, এখন আমি স্রেফ একজন ফ্রিল্যান্সার, যে অন্ধকারের ভেতরে নিজের একটা জগত তৈরি করে নিয়েছে। এই জগতে কোনো কমান্ড নেই, কোনো স্যালুট নেই আছে কেবল নিখুঁত পরিকল্পনা আর তার সফল বাস্তবায়ন।

সকালের পত্রিকার সেই হেডলাইনটা এখন অনলাইনে পুরনো নিউজের পাতায় চলে যাচ্ছে। মানুষ নতুন কোনো আলোচনার বিষয় খুঁজে পেয়েছে। আরিফদের মৃত্যু নিয়ে যে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছিল, তা স্তিমিত হয়ে আসছে। এটাই স্বাভাবিক। এই শহরে প্রতি সেকেন্ডে হাজার হাজার ডেটা তৈরি হয়, তার ভিড়ে একটা ‘দুর্ঘটনা’ স্রেফ কয়েক লাইনের খবর ছাড়া আর কিছুই না।

আমি আমার কফি মেকারটা পরিষ্কার করে রাখলাম। পরবর্তী কয়েক দিন আমি নওরীনের সাথে কোনো যোগাযোগ করব না। ওকে সময় দেওয়া দরকার। তাছাড়া আমিও এখন একটু একা থাকতে চাই। আমার এই ডার্ক রুমে কোনো মানুষের ছায়া পড়া মানেই নতুন কোনো জটিলতার শুরু।

আমি কম্পিউটারের মাউসটা হাত দিয়ে সরিয়ে রাখলাম। স্ক্রিনে আমার ওই পোর্টফোলিও সাইটটা জ্বলজ্বল করছে। কোডগুলো একদম নিখুঁত, কোনো বাগ (bug) নেই। ঠিক যেমনটা আমি চেয়েছিলাম।

আমি ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোর দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললাম, “The system is rebooted. No errors found.”

এখন কেবল প্রশান্তির একটা ঘুম দরকার। যে ঘুমে কোনো লুসিড ড্রিমিং থাকবে না, কোনো মিশন থাকবে না থাকবে কেবল নিশ্ছিদ্র নীরবতা। শহরটা ঘুমিয়ে আছে, আর তার সাথে ঘুমিয়ে আছে কিছু না বলা সত্য। সেই সত্যগুলো আমার এই মুসো ব্ল্যাক দেওয়ালের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কেউ জানবে না, কেউ বুঝবে না।

সেই রুপোর চেইনটার কথা আপনাদের মনে আছে? আমি ড্রয়ারে রাখা সেই রুপোর চেইনটা বের করে জানালার বাইরে ছুড়ে ফেলে দিলাম। ওটা নিচে কোথায় গিয়ে পড়ল, তা দেখার প্রয়োজন বোধ করলাম না। আমার জীবনে এখন আর কোনো ট্রফি বা স্মারকের দরকার নেই। আমি কেবল বর্তমানের ভেতরে বাস করতে চাই।

আমার এই সাধারণ ফ্রিল্যান্সার জীবনে ঝড় এসেছিল, আবার চলেও গেছে। রেখে গেছে কেবল একটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ল্যান্ডস্কেপ।

“Next mission? Not interested right now. System is in sleep mode.”

ঘুমিয়েছি, বোধহয়, দশ মিনিটও হবে না। একটা অদ্ভুত অস্বস্তিতে আবার ঘুম ভেঙে গেল। মনে হচ্ছে আমার কম্পিউটার চেয়ারটাতে কেউ একজন বসে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আপনারা আগে থেকেই জানেন আমার রুমটা অস্বাভাবিক রকমের অন্ধকার। কাজেই তাকে দেখতে পাওয়াটা সম্ভব নয়।

আমার আবার একটা অভ্যাস আছে। আমার ঘুম ভেঙে গেলেও, যতক্ষণ না আমি আমার চোখে আলো পড়ছে, ততক্ষণ আমি আবার কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকলেই ঘুমাতে পারি। কিন্তু আপনারা তো মনে হয় সেই "phenomenon" টা সম্পর্কে জানেন। যে অন্ধকার একসময় চোখে সয়ে আসে। যদিও আমার এই dark room-এ সেই phenomenon খুব একটা কাজ করে বলে আমার মনে হয় না, তবে আমার এই রুমের সাথে অভ্যস্ত হওয়ার কারণে আমার ক্ষেত্রে কিছুটা করলো। 

আমি আমার কম্পিউটারের চেয়ারে আবছা একটা ছায়া দেখলে পেলাম। 

ইরা ?

কিন্তু তার তো আমার সাথে কোন কাজ থাকার কথা নয়। এ কথা ভাবতে ভাবতেই মোবাইলটা হাতে নিয়ে রুমের লাইটটা জ্বালালাম। 

না, ইরা নয়। অন্য একটা মেয়ে। তবে এই মেয়ের তার পরিচয় আমার কাছে ব্যাখ্যা করতে হলো না। এই মেয়েটার ঘটনাটা আমি জানি। দুদিন আগে পড়েছিলাম খবরে। খবরে বলতে Facebook এর News Feed এ। নামটা এই মুহূর্তে ঠিকমতো মনে পড়ছে না। তবে সম্ভবত নাদিয়া। মফস্বলের একটা শহরে একলা থাকতো। একটা কোম্পানির brand ambassador হিসেবে কাজ করতো। দুদিন আগে আত্মহত্যা করে মারা গেছে। বুঝতে পারছি না, এই আত্মহত্যাকারীরা সব আমার সাথে কেন দেখা করতে আসছে। তাদেরও দিকেও কি কোন নেটওয়ার্ক কাজ করে? তাছাড়া আমি তো তাদের কোন কাজের লোক নই। 

এই মেয়েটাকেও মনে রাখার মতো বিশেষ কোনো কারণ আমার যদিও ছিল না। মৃত্যুর আগে একটা হাতে লেখা কাগজে আত্মহত্যার কারণ লিখে গেছে। একটা ছেলের নাম মেনশন ছিল সেখানে। কি নাম ছিল মনে নাই। 

প্রথমে আমার নিজেরই একবার মনে হলো, আমি কি কোন মানসিক রোগী হয়ে যাচ্ছি ধীরে ধীরে? 

তারপরে আমি নিজেই ভাবলাম যে, এত দুর্বল নার্ভের লোক আমি নই। যে সামান্য একটা খবর দেখে আমি তাকে আমার রুমে ইমাজিন করতে শুরু করব। তাছাড়া, মেয়েটার চেহারাও আমি খুব একটা ভালো করে খেয়াল করে দেখিনি। যে পরবর্তীতে আমার মনে থাকবে এবং আমি তাকে ইমাজিন করব। 

এই যে আপনাদেরকে এতগুলো কথা বললাম, আপনাদের হয়তো মনে হচ্ছে যে একে সামনে বসিয়ে নিয়ে আমি তার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে এগুলো ভাবছি। ব্যাপারটা ঠিক সেরকম নয়। এ সম্পূর্ণটা ভাবতে আমার সময় লেগেছিল সর্বোচ্চ দুই থেকে আড়াই সেকেন্ড। 

তো আমি মেয়েটার দিকে ফিরে বললাম, "আপনার নাম সম্ভবত নাদিয়া। তাই না?" 

মেয়েটা জবাব দিল, "জি স্যার।" 

আপনি তো আত্মহত্যা করেছিলেন। 

অবশ্য ব্যাপারটা সেভাবে sure হয়ে বলা যাচ্ছে না। কারণ আমাদের দেশের নিউজ তো এরা যা ইচ্ছা তাই লেখে। আসল ঘটনা চাপা দেয়। 

আপনার এই ঘটনাটা তো আত্মহত্যাই ছিল, তাই না? নাকি অন্য কোন ঘটনা? 

না দিয়ে উত্তর দিলো, আত্মহত্যাই ছিল, স্যার। অন্যরকম কোন ঘটনা নেই এর পিছনে। 

আমি বললাম, আমাকে স্যার স্যার করবেন না। আমি কোন পুলিশের কর্তা নই। 

তা বলুন, আপনার জন্য কি করতে পারি? আমার সাথে দেখা করার বিশেষ কোন কারণ? 

মেয়েটা উত্তর দিল, "আমার ভয় হচ্ছে ছেলেটাকে নিয়ে।" 

আমি তখন উত্তর দিলাম, "মৃত্যুর পরও তাকে নিয়ে কিসের ভয়? কি ঘটনাটা কি ছিল ছেলেটার?"

সে অনেক কথা। বলেই কাঁদতে শুরু করলো নাদিয়া। 

আমি এবার বেশ স্বাভাবিকভাবে গলার স্বর কিছুটা ঠান্ডা করেই বললাম, 

“দেখুন, এক্ষেত্রে আমার কিছুই করার নেই। আমি যতদূর শুনেছি, আপনার ব্যাপারটি আমলে নিয়েছে পুলিশ। ভরসা রাখুন, দেখুন কি হয়। 

আপনি যেভাবে লিখেছেন যে আপনি ছেলেটাকে বাঁচাতে চান এবং মৃত্যুর পরেও তাকে ভালোবেসে যাবেন, অথচ আবার নিজেই লিখে রেখেছেন যে আপনার মৃত্যুর জন্য ওই ছেলে দায়ী। এমনকি তার পিতার নামও সম্ভবত সেখানে লিখেছিলেন আপনি। কাজেই আমার মনে হচ্ছে না, সে অতি সত্তর এটা এই ঝামেলা থেকে রেহাই পাবে।” 

তারপর না দিয়া হঠাৎ করে উঠে দাঁড়ালো। তারপর আমাকে বলল যে, 

“আমি আসলে আপনার কাছে কি কারণে এসেছিলাম, তা আমি নিজেই জানি না। আমি চলে যাচ্ছি।”

এই কথা বলে সে চলেও গেল। 

তো, এই সম্পূর্ণ কথাবার্তার মধ্যে থেকে আমি যে সারাংশ বের করলাম, তা হলো সে এই রাত্রেবেলায় শুধুমাত্র ”সে অনেক কথা” কথাটুকু বলার জন্য আমার ঘুম ভাঙিয়েছে। থাকে কিছু কিছু মানুষের অদ্ভুত অদ্ভুত কিছু খেয়াল মাঝে মাঝে মাথায় কাজ করে; নাদিয়ারও হয়তো তাই করেছে। 

আর এমন কি বা করেছে? সামান্য ঘুমই তো ভাঙিয়েছে। আমি হয়তো আবার আরও ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে ঘুমিয়ে যাব, কিন্তু আমার কাছে অদ্ভুতভাবে এই মানুষগুলোকে দেখতে পাওয়ার ঘটনাটাকে স্বাভাবিক লাগছে। এর মধ্যে কোন অস্বাভাবিকতা আমি খুঁজে পাচ্ছি না। ব্যাপারটা অদ্ভুত। 

পরদিন গাড়িটা নিয়ে খুলনা গেলাম মেয়েটার বাসাটা ওখানেই ছিল। ওর পোষা দুটো বিড়াল ছিল। আমি মূলত এসেছি বিড়াল গুলোকে নিয়ে যেতে। 

তো বিড়ালগুলো নিয়ে খেয়ে নওরিনের হাতে দিয়ে দিলাম, বিড়াল গুলো পেয়ে সে খুব খুশিই হলো।

খুলনা থেকে ঢাকা ফেরার পথটা দীর্ঘ ছিল। গাড়ির পেছনের সিটে নাদিয়ার সেই দুটো বিড়াল একটা সাদা আর একটা ধূসর। ওরা খুব একটা শব্দ করেনি, মাঝেমধ্যে শুধু মিউ মিউ করে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছিল। আমি যখন হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছিলাম, তখন অদ্ভুত একটা সমীকরণ মেলানোর চেষ্টা করছিলাম। মানুষ মরে যায়, তার অভিমান আর অভিযোগগুলো একটা সুইসাইড নোটে বন্দি হয়ে থাকে, কিন্তু তার পোষা প্রাণীদের জন্য কোনো 'ব্যাকআপ প্ল্যান' থাকে না।

নওরীনের হাতে যখন বিড়াল দুটো তুলে দিলাম, ওর চোখের সেই উজ্জ্বলতাটুকু ছিল গত কয়েকদিনের অন্ধকারের পর প্রথম কোনো প্রদীপ। ও বিড়ালদুটোকে আদর করতে করতে জিজ্ঞেস করল, "কোথায় পেলে এদের?"

আমি শুধু বললাম, "এক ফ্রেন্ডের ছিল। সে আর নেই, তাই নিয়ে আসলাম।" নওরীনের চোখে তখন কৃতজ্ঞতা। ও জানে না যে এই বিড়ালগুলো কোনো ফ্রেন্ডের নয়, বরং…সব কথা যে শুনতে হবে তা তো নয় তাই না ? খুলনা থেকে ঢাকা প্রায় ২৪০ কিলোমিটারের এই দীর্ঘ পথটা আমি যখন পাড়ি দিচ্ছিলাম, তখন বাইরের আকাশটা ছিল ধূসর। বিএমডব্লিউ-র এসি কেবিনের ভেতরে বিড়াল দুটোর মিউ মিউ শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ ছিল না। বিড়ালগুলো সম্ভবত তাদের মালিককে খুঁজছিল, কিংবা হয়তো তারা বুঝতে পেরেছিল যে তাদের পুরনো জগতটা চিরতরে বদলে গেছে।

আমি স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে ভাবছিলাম নাদিয়ার কথা। একটা মেয়ে মারা যাওয়ার পর কেন আমার অন্ধকার ঘরে এসে দাঁড়াবে? কেনই বা সে কাঁদতে কাঁদতে বলবে যে সে ওই ছেলেটাকে বাঁচাতে চায়? যে ছেলেটা তার আত্মহত্যার কারণ, তাকেই আবার মৃত্যুর পর রক্ষা করার এই অদ্ভুত আকাঙ্ক্ষা এটা কি ভালোবাসা, নাকি কোনো জটিল মানসিক ট্রমা? আমি একজন লজিক্যাল মানুষ, আমার কাছে এই ইমোশনগুলোর কোনো গাণিতিক ব্যাখ্যা নেই।

নওরীনের হাতে যখন বিড়াল দুটো তুলে দিলাম, ওর চোখের উজ্জ্বলতা দেখে মনে হলো গত কয়েক রাতের সমস্ত ক্লান্তি এক নিমেষে ধুয়ে গেছে। ও বিড়াল দুটোকে কোলে নিয়ে আদর করতে করতে আমার দিকে ফিরে তাকাল।

নওরীন বিড়াল দুটোর নাম রাখল 'মেঘ' আর 'বৃষ্টি'। ও জানে আমি কখনো কারণ ছাড়া কোনো কাজ করি না। কিন্তু ও এটাও জানে যে আমাকে জোর করে কোনো কথা বলানো সম্ভব নয়। ও কেবল বিড়বিড় করে বলল, “তুমি খুব অদ্ভুত এনাম। কখনো তুমি যমদূত হয়ে আসো, আবার কখনো তুমি অবলা প্রাণীদের উদ্ধারকর্তা। তোমার এই বৈপরীত্য আমাকে মাঝেমধ্যে খুব বিভ্রান্ত করে।”

আমি কোনো উত্তর না দিয়ে বেরিয়ে এলাম। আমার কাজ শেষ।

চলবে…

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ