ফ্রীল্যান্সার (পর্ব - ২)




 আগের পর্বতে তো আপনারা জেনেছিলেন যে আমার ঘুম আসছিল না। তবে শরীর ক্লান্ত ছিল তো এক পর্যায়ে এভাবে আস্তে আস্তে ঘুমিয়েই পড়ি। তারপরেই শুরু হয় আমার স্বাভাবিক জীবনযাপন। আমার বছরের অধিকাংশ সময়ই আমার কোনো কাজ থাকে না। তবে যখন কাজ আসে, তখন সেটা খুব সিরিয়াসই হয়। 


আপনাদের ওই ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন ডাক্তার নওরীনের কথা মনে আছে?

তো, সে এসেছিল আমার সাথে দেখা করতে। আমি এই মেয়েটার মতিগতি ঠিক বুঝি না। আমার কাছে কি চায়? কেন আসে? আর আমি লোক হিসেবে খুব shady type এর একজন। আমি এই মেয়েটাকে ঠিক বুঝি না। অবশ্য বোঝার চেষ্টাও করি না।আমার করার চিন্তা করার মতো অনেক বিষয় আছে। আমি সেগুলো নিয়ে চিন্তা করতে বেশি পছন্দ করি। অহেতুক একটা মেয়েকে নিয়ে চিন্তা করে নষ্ট করার মতো সময় আমার নেই। না, কথাটা মিথ্যা বলা হলো। আমার সময় আছে, প্রচুর সময় আছে। কিন্তু ইচ্ছা নেই। আমি আবেগ অনুভূতিহীন "রোবট" টাইপের মানুষ। তো একদিন বসে বসে কম্পিউটারে কাজ করছিলাম। সেই সময় দরজায় কে যেন নক করল। কে আর নক করবে? আমার বিশেষ কোনো বন্ধু বান্ধব নেই। নওরীনই হয়তো হবে।আর এখন যা সময় হয়েছে, সেটা নওরীনের ডিউটি শেষ হওয়ার সময়। তো হয়তো ডিউটি শেষ হওয়ার পর আমার এখানেই এসেছে সরাসরি। 


তো আমিদরজার সামনে দাঁড়িয়ে আমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। তাড়াহুড়া করার মতো কোনো কারণ ছিল না। নকটা আবার পড়ল একই রিদমে, একই ধৈর্যে। মানুষ সাধারণত এভাবে নক করে না। এতে অস্থিরতা থাকে না, তাড়া থাকে না। বরং একটা নিশ্চিত ধারণা থাকে ভিতরে যে আছে, সে দরজা খুলবেই।

আমি দরজা খুললাম।

আমার ধারনা ঠিক ছিলো, নওরিন দাঁড়িয়ে আছে। চোখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, মনে হচ্ছে ডিউটি শেষ করেই এসেছে। চুলগুলো একটু এলোমেলো, কিন্তু দৃষ্টিটা অস্বাভাবিকভাবে স্থির। সে কিছু না বলে ভেতরে ঢুকে পড়ল। আমি দরজা বন্ধ করে দিলাম।

রুমে ঢুকেই সে থেমে গেল। অন্ধকারটা প্রথমে সবাইকে কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে তোলে। । কারও চোখ অভ্যস্ত হতে সময় লাগে, কারও মাথা। নওরিনের ক্ষেত্রে দুটোই দ্রুত হলো। সে ধীরে ধীরে চারপাশে তাকাল, যেন জায়গাটাকে বুঝে নিতে চাইছে। সে যে এখানে আজই প্রথম এসেছে, তা কিন্তু নয়। 

“তুমি এখানে থাকো কিভাবে?” সে জিজ্ঞেস করল।

“আমার থাকতে কোনো সমস্যা হয় না,বরং এটাই আমার ভালো লাগে। আর আমার ভালো লাগে বলেই আমি এটা তৈরি করেছি।” আমি স্বাভাবিক গলায় বললাম।

সে দেওয়ালের খুব কাছে গিয়ে হাত বাড়িয়ে আবার থামিয়ে দিল। স্পর্শ করল না। শুধু দেখল।

“এটা আলো শোষণ করে, তাই না?”

“হ্যাঁ।”

সে হাতটা সরিয়ে নিয়ে আমার দিকে তাকাল।
“তুমি ইচ্ছা করে এইসব করেছো?”

“আমি যা করি, ইচ্ছা করেই করি।”

কিছুক্ষণ নীরবতা থাকল। তারপর সে সরাসরি প্রসঙ্গে চলে এল।

“ইরার ব্যাপারটা তুমি হ্যান্ডেল করেছো, তাই না?”

আমি সিগারেট ধরালাম। আর বললাম। “ধরে নিতে পারো।”

“কেন?”

“কৌতূহল।”

সে হালকা হাসল, কিন্তু সেটা আনন্দের ছিল না।
“তুমি সবকিছুর উত্তর এভাবে দাও কেন?”

“কারণ সেটাই যথেষ্ট।”

সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“তুমি জানো, ওই কেসটা ময়না তদন্ত হলে অনেক কিছু বের হতে পারত? কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। আর কেন সম্ভব হয়নি জানো?”

“কারণ তুমি হতে দাওনি।”

আমি এবার তার দিকে তাকালাম।
“তুমি কি আমাকে জেরা করতে এসেছো?”

সে মাথা নাড়ল।
“না। বুঝতে এসেছি।”

“কি?”

সে একটু ভেবে বলল,
“তুমি আসলে কি ধরনের মানুষ।”

আমি কোনো উত্তর দিলাম না। কারণ প্রশ্নটা অপ্রাসঙ্গিক।

আমি কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললাম। ”পোস্টমর্টেমের রিপোর্ট আসলে কি হতো? একটা মামলা হতো তার ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে। তারপর সেটা কোর্টে দিনের পর দিন ঘুরতো। তারপর, কোন ফাইলের স্তূপের নিচে ওর ফাইলটা চাপা পড়ে যেত। তারপর সাক্ষী-সাবুদের অভাবে ওই শিক্ষক মুক্তি পেয়ে যেত। তোমাদের দেশের এই অন্ধ জুডিশিয়াল সিস্টেমকে আমি **। মাঝখান থেকে ওই মেয়েটার সাথে কি হতো? ওর দেহটাকে ছিন্নভিন্ন করে কাটাছেঁড়া করা হতো।


পোস্টমর্টেমের নামে তোমরা কি করো, তোমরা তো ভালোই জানো। তুমি তো ডাক্তার, তাই না? 


নওরিন বলল, "না, আমি এখনও ডাক্তার না। আমি ইন্টার্ন ডাক্তার।" 


আমি বললাম, "ও আচ্ছা, ইন্টার্ন ডাক্তার, তো নিজের পেশা নিয়ে চিন্তা করো না। তুমি হঠাৎ করে আইনজীবীর মতো আমাকে জেরা করতে কেন এসেছ?" 


নওরীন তখন আমাকে উত্তর দিল যে, ”ওই শিক্ষকের বিচার হওয়া দরকার। ওনার বিরুদ্ধে এরকম আরও অনেক "complain" আছে। একটা মেয়ে তার জীবন দিয়ে এই বিচারটা করার একটা রাস্তা করে দিল, আর তুমি সেটা নষ্ট করে দিলে। কেন এনাম? টাকার জন্য? আসলে কি কাজ করো তুমি? সত্যি করে বলো তো আমাকে।”


আমি খুব স্বাভাবিক গলায় বললাম, আমি একজন ফ্রিল্যান্সার। আর হ্যাঁ, টাকা ছাড়া আমি একটা কাজও করি না, সেটা ঠিক।


তবে এই কাজটা আমি কিসের জন্য করেছি, সেটা তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করবে না। কারণ এটার উত্তর আমি দেব না। 


নওরিন তখন আমাকে বলল,


"তুমি যখন বলেছ যে বলবে না, তার মানে তুমি বলবেই না। কিন্তু মেয়েটার বিচার পাওয়ার রাস্তাটা তুমি আটকে দিলে?"

আমি বললাম, বিচার করার মালিক আমি না। 


তারপর একটা সিগারেট ধরাতে, ধরাতে বললাম, আচ্ছা আমরা এই topic টা এখন বাদ দেই । আমি আরও বললাম, কোথাও ঘুরতে যাবে? অনেকদিন কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয় না। বাইরের ফ্রেশ হাওয়াটা উপভোগ করা হয় না অনেকদিন। তাছাড়া, বাদ দাও না; ইরার পরিবারই তো চায়নি যে ওর ময়নাতদন্ত হোক। তো এখন এটা নিয়ে এত কথাবার্তা বলার কি আসলেই কোন প্রয়োজন আছে? 


নওরিন নির্লিপ্ত গলায় বলল, "আসলে আমি ওই লোকটার বিচার চেয়েছিলাম।" আর তোমাকে এর মধ্যে জড়াতে দেখে আমার মনে হলো, তুমি ওই লোকটার হয়ে কাজ করছো। তাই এত কথা বললাম। 


আমি তখন নওরীনকে একটু সিরিয়াস হয়ে বললাম,


"নওরিন, তুমি কি আসলে আমাকে ক্রিমিনাল মনে করো?" 


নওরিনও শান্ত গলায় উত্তর দিল;


"তোমাকে ক্রিমিনাল মনে করলে, তোমার এই অদ্ভুত ফ্ল্যাটে একা একা কখনোই আমি আসতাম না।" 


পরিস্থিতিটা অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে।


তাই এই পরিস্থিতিটা হালকা করার জন্য আমি নওরিনকে বললাম,


“ঠিক করো তো, কোন জায়গায় ঘুরতে যাওয়া যায় ঢাকায় বা ঢাকার কাছাকাছি?”

নওরীন বলল, "ঢাকায় আবার ঘোরার জায়গা আছে নাকি?" 


তাছাড়া, "কালকে আবার আমার ডিউটি আছে। আমি এই সপ্তাহটা খুব ব্যস্ত থাকবো। এখন ঘোরার সময় নেই। এখন আমি আমার হলে ফেরত যাচ্ছি। তুমি সাবধানে থেকো, ভালো থেকো।" 

তো, আমি নওরীনকে বিদায় দিয়ে এসে কম্পিউটারটা অন করে "ডেল্টা ফোর্স" গেমটা আবার খেলতে শুরু করলাম। আমি এবার প্রচুর গেম খেলি। ও হ্যাঁ, আমার আবার আরও একটা শখ আছে। আমি ফটোগ্রাফি করি। তো, recently একটা DSLR কিনেছিলাম। তো সেটা নিয়ে প্রায়ই আমি ঘুরতে বেরোই, ফটোগ্রাফি করি। ভালো লাগে। এই আর কি। 


এই সপ্তাহটা এভাবেই কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু মাঝখান থেকে ঘটে গেল একটা অদ্ভুত ঘটনা। আসলে নওরিন পুরো সপ্তাহটা জুড়ে ব্যস্ত ছিল। ওর সাথে তেমন যোগাযোগও করা হয়নি। তাছাড়া, আপনি যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন যে ব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটা আমার কাছে কি, সেটা হলো নওরিন আর আমার এই দুজনের মধ্যকার সম্পর্কটা আসলে কি? এটাই সেই প্রশ্নটা। বাকি সব প্রশ্নের উত্তর আমি চিন্তা করে কোনো না কোনোভাবে আপনাকে বের করে দিতে পারবো। হয়তো কিছুটা সময় লাগবে, কিন্তু অবশ্যই দিতে পারবো।


অদ্ভুত ঘটনাটার সূত্রপাত নওরিনের একটা ফোন কল থেকে। আমি উত্তরার বাউনিয়ার জসীমউদ্দীন রোডের ওদিকে, যেদিক থেকে বিমান ল্যান্ড করে, ওখানে বিমানের ফটোগ্রাফি করতে গিয়েছিলাম। তখন নওরিনের একটা ফোন কল আসে আমার কাছে। ফোন কলে নওরিন বলে যে, 


”তুমি যেখানেই থাকো আর যে কাজই করতে থাকো, এই মুহূর্তে এক্ষুনি আমার হাসপাতালে আসো। তোমার সাথে জরুরি কথা আছে।”


আপনারা হয়তো ভাবছেন, ওর এই ফোন কল পেয়ে আমি পাগলা ঘোড়ার মতো আমার গাড়ি ছুটিয়ে ওর হাসপাতালের দিকে যাচ্ছি। না, ব্যাপারটা আসলে একেবারেই সেরকম না। আমি আমার মতো কিছুক্ষণ ফটোগ্রাফি করলাম, চা খেলাম, সিগারেট খেললাম। তারপর গাড়িটা স্টার্ট করে ধীরে ধীরে ওর হাসপাতালের দিকে যেতে শুরু করলাম। 


তো, ওর হাসপাতালে পৌঁছানোর পর গাড়িটা পার্ক করে ICU-র সামনে গিয়ে দেখলাম, ও ডিউটিরত অবস্থায় আছে। 


আমি হাত নেড়ে ইশারা করে ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম। 


ও আমাকে ইশারা করলো যে একটু অপেক্ষা করতে।


তো কিছুক্ষণ পর ও বেরিয়ে আসলো। বেরিয়ে এসেই আমার হাত ধরে টানতে টানতে সোজা ক্যাফেটেরিয়ার দিকে নিয়ে চলে গেল। ওখানে গিয়ে আমাকে বলল, "গতকাল রাত্রে তুমি কোথায় ছিলে?" 


আমি খুব স্বাভাবিক গলায় বললাম, "আমি বাসায়ই ছিলাম। আর তুমি জানো যে আমি বাসায় থাকলে ডেল্টা ফোর্স গেমটা খেলি।" কেন? কি হয়েছে? 


নওরিন ফিসফিস করে আমাকে বলল, "ইরার ঘটনাটা ভুলে যাও নি নিশ্চয়ই?" 


আমি বললাম, "না, ভুলে যাব কেন? কি হয়েছে?" 


নওরিন তখন উত্তর দিল, "যে শিক্ষক ওকে পরপর ছয়বার ফেল করিয়েছিল" তার কথা মনে আছে নিশ্চয়ই। তার সাথে কি হয়েছে জানো ?

আমি বললাম ”না জানিনা, কারণ জানাটা আমার জন্য জরুরি না” 


নওরীন বললো গতকাল রাত্রে উনি রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গিয়েছেন। এবং দুর্ঘটনাটি দেখে পুলিশ সন্দেহ করছে, এটি দুর্ঘটনা নয়। ওনাকে আগে হত্যা করা হয়েছে। তারপর রাস্তায় নিয়ে গিয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এবং ফেলে দেওয়ার পর তার উপর দিয়ে একাধিকবার হেভি ট্রাক চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। 


আমি বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে বললাম, "ও তাই নাকি?" ভালোই তো হয়েছে। That spoild brat deserves it! 

নওরিন আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল,


“এনাম, গতকাল রাতে তুমি কোথায় ছিলে?” 

 

আমি নওরীনকে উত্তর দিলাম,


আমি আগেই বলেছি, আমি বাসায় ছিলাম, গেম খেলছিলাম। আর এক প্রশ্ন বারবার করে আমাকে মোটেই বিরক্ত করবে না। এটা আমার ভালো লাগে না। আর আমার ধারণা, তুমি আমাকে এই প্রশ্নগুলো করছো কারণ তুমি মনে করছো এই ঘটনাটার সাথে আমি জড়িত। কিন্তু তোমার বোঝা উচিত যে আমি একজন ফ্রিল্যান্সার। আমি কোন ট্রাক ড্রাইভার বা contract killer নই। 


নওরিন আমাকে খুব শান্ত গলায় বলল,


"এনাম, জানো, তোমার প্রতি ছবিটা আমার কাছে কিরকম? আমি যখন তোমাকে কল্পনা করি, তখন আমি দেখতে পাই একটি কুয়াশাচ্ছন্ন জঙ্গলের ভিতরে অনেকগুলো এনাম। সব সবাই একই রকম দেখতে। কোনটা আসল, কোনটা নকল বোঝা যায় না। কেমন যেন একটা ধোঁয়া ছড়িয়ে রয়েছে চারিদিকে।"


আমি তখন হাসতে হাসতে নওরিনকে বললাম,


“ডাক্তার সাহেব, এমনি আপনার মাথার উপর এখন অনেক চাপ। পড়াশোনা, ইন্টার্নশিপ সব মিলিয়ে আপনি খুব চাপের মধ্যে আছেন। আমাকে নিয়ে এত ভাবতে হবে না। আর ওই ঘটনার কথা বলতে গেলে, আপনি নিশ্চিত থাকেন ওই ঘটনার সাথে আমি জড়িত নই।” 

এখন চলুন, কফি খাই। 

তো কফি খেয়ে নওরিনকে বিদায় জানিয়ে আমি আমার ফ্ল্যাটে ফিরলাম। 


ফ্ল্যাটে ফিরে চেঞ্জ করে বিছানাতে শুতে গেলাম। আসলে, আমি খুব ক্লান্ত। ঘুম আসছিল। 


আসলে গত দুই দিন যাবত আমি একটা কাজে বাইরে ছিলাম। নওরিনকে তখন আমি মিথ্যা বলেছি। আমি গতকাল রাতে বাসায় ছিলাম না। কাজের সুবাদে আমি দুই দিন যাবত বাইরে। আর নওরিনকে মিথ্যা বলার কারণ হচ্ছে যে, আমি যদি ওকে বলতাম যে গতকাল আমি ফ্ল্যাটে ছিলাম না, তাহলে ও নিজে থেকেই একটা গল্প কল্পনা করে নিত এবং সেটা নিয়ে আমার দিকে ছুড়ত হাজার প্রশ্নবান। এত প্রশ্নের উত্তর দিতে আমার মোটেই ভালো লাগত না। তাই এই মিথ্যা বলে ব্যাপারটা এড়িয়ে গিয়েছি আর কি। 



আর আপনাদেরকে যে ফটোগ্রাফির কথা বললাম না, ওটা আসলে আমি ফেরার পথে ওই দিক দিয়েই ফিরছিলাম তো। তাই ভাবলাম কিছু কটা বিমানের ফটোশুট করে নিয়ে যাই।


এই কারণেই ওদিকে যাওয়া। এই আর কি। 

তো নওরীন এর কাছ থেকে আমি চলে এসেছিলাম ঠিকই, কিন্তু আমি জানতাম ঘটনাটা এখানেই শেষ হতে যাচ্ছে না ।  তো আমি এটার কনসিকোয়েন্সের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। 

তো এভাবে আরও দুদিন পার হয়ে গেল নওরিনের সাথে আর যোগাযোগ হয়নি।

রাত তখন ০৩:১২ মিনিট। আমার ডার্ক রুমের OLED প্যানেলে ডেল্টা ফোর্সের ম্যাপটা স্থির হয়ে আছে। হাতে একটা সিগারেট, কিন্তু সেটায় টান দিতে ভুলে গেছি। আমার মাথায় ঘুরছে নওরীনের সেই কথাগুলো; ‘কুয়াশাচ্ছন্ন জঙ্গলের ভেতরে অনেকগুলো এনাম’। মেয়েটার কল্পনাশক্তি ভালো, তবে বাস্তবতা তার চেয়েও বেশি ধূসর।

আমি কেন মিথ্যা বললাম? কারণ সত্যটা নওরীনের মতো সাদা-সিধা মানুষের সহ্য করার ক্ষমতার বাইরে। গত দুদিন আমি কোথায় ছিলাম, সেটা যদি সে জানতো, তবে হয়তো তার ইন্টার্নশিপের বাকি সময়টুকু সে শান্তিতে ডিউটি করতে পারতো না। আমি বাউনিয়ায় বিমানের ছবি তুলছিলাম ঠিকই, কিন্তু লেন্সের ফোকাস শুধু বিমানের ডানায় ছিল না। ছিল অন্য কিছুতে।

হঠাৎ দরজায় আবার নক পড়ল। এবার আর নওরীনের সেই ছন্দময় নক নয়। এবার নকটা ছিল ভারী, যান্ত্রিক এবং কর্তৃত্বব্যঞ্জক। আমি আমার ওপর কারো কর্তৃত্ব একেবারেই পছন্দ করিনা । 

আমি দরজা খুললাম, কিন্ত ইচ্ছা করেই দেরী করে খুললাম। সামনে দাঁড়িয়ে আছে স্যুট পরা এক ব্যক্তি। মাঝবয়সী, ক্লিন শেভড, চোখে দামি ফ্রেমের চশমা। দেখে মনে হবে কোনো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সিইও। কিন্তু আমি জানি, তার স্যুটের নিচে লুকানো আছে একটা সাইলেন্সড পিস্তল। আর ওয়াকি টকিটা তো দেখাই যাচ্ছে, লোকটাকে আমি খুব প্রফেশনাল ভেবেছিলাম কিন্তু লোকটা ততটা প্রফেশনাল নয় বরং আনাড়ি। 

“ভেতরে আসতে পারি, এনাম সাহেব?” লোকটার কণ্ঠে একটা কৃত্রিম ভদ্রতা।

আমি বললাম ” হু, কারণ এত রাত্রে আমি এখন বাইরে কোথাও যেতে পারবো না”

[ আপনারা হয়তো ভাবছেন এত রাত্রে একজন অপরিচিত লোককে পিস্তলসহ আমি আমার ঘরে কিভাবে প্রবেশ করতে দিলাম। আসলে আমার প্রফেশনের কারণে আমি এসবের সাথে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি , উনার সাথে যদি আরো পাঁচজন আর্মড গার্ড থাকতো তাতেও আমি খুব একটা অবাক হতাম না এভাবেই আসতে বলতাম তাদের ভেতরে, যাইহোক আমরা এখানে আমার প্রফেশনের মেটামর্ফোসিস করতে বসিনি, চলুন ঘটনায় ফেরার যাক ]

আমি আমার হাতের সিগারেটটা তে একটা টান দিয়ে ভেতরের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম, সে আমার পিছন পিছন আসলো। সে ভেতরে ঢুকে চারপাশটা দেখল। আমার Musou Black দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে সে কিছুটা অবাক হলো।

“চমৎকার রুচি আপনার। পুরো রুমটাই যেন একটা ব্ল্যাক হোল। কোনো তথ্যই এখান থেকে বের হওয়ার সুযোগ নেই, তাই না?” সে সোফায় বসতে বসতে বলল।

আমি কম্পিউটার বন্ধ করে তার মুখোমুখি বসলাম। “সরাসরি কথায় আসুন। লোকটা হাসল। 

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। “আপনার জানার কথা, আমি ফ্রিল্যান্সার। কোন ফালতু Contract killer না, ওটা একটা সম্ভবত অ্যাক্সিডেন্ট ছিল।”

“অ্যাক্সিডেন্ট? একটা মানুষের শরীরের ওপর দিয়ে তিনবার ট্রাক চলে যাওয়াটা কি অ্যাক্সিডেন্ট?” লোকটার চোখ এবার তীক্ষ্ণ হলো। “আমাদের ইনভেস্টিগেশন বলছে, ট্রাক ড্রাইভারটা মাতাল ছিল না। বরং সে খুব নিখুঁতভাবে তার কাজটা করেছে।”

আমি আপনাকে আরো দুটো কথা বলি এক নম্বর কথাটি হচ্ছে যে আপনি মিথ্যা কথা বলায় একেবারেই পারদর্শী নন, আর দ্বিতীয় কথাটি হচ্ছে আপনি অভিনেতা হিসেবেও খুব খারাপ আপনি কোন পুলিশের লোক নন। তবে আপনি কে সেটা জানার কোন ইচ্ছাও আমার নেই।

লোকটা বলল আপনার এই বিশেষ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার কারণটা জানতে পারি কি? যে কেন আপনার মনে হল যে আমি পুলিশের লোক নই?
আমি জিজ্ঞেস করলাম আপনার নামটা?
লোকটা জবাব দিল ”শহীদুল ইসলাম”
আমি উত্তর দিলাম “আমি আপনাকে আগেই বলেছি যে আপনি মিথ্যা কথা বলায় পারদর্শী নন এটা আপনার আসল নাম নয়। যেহেতু আপনি পরিকল্পনা করেই এসেছেন যে আপনি আপনার পরিচয় দিবেন না সেহেতু আপনি আপনার নামটা না বললেই পারতেন। তো মিথ্যা পরিচয়দানকারী জনাব শহিদুল সাহেব আপনি কথাটা মনে রাখুন বাংলাদেশের পুলিশ রাত সাড়ে তিনটার সময় সুট-বুট পড়ে সাইলেন্সার ওয়ালা পিস্তল নিয়ে কাউকে জেরা করতে যায় না”
লোকটা বলল “আপনার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা খুব অসাধারণ এনাম সাহেব, অবশ্য হওয়াটাই স্বাভাবিক”

আমি চুপ করে রইলাম। এই নীরবতা আমার ঢাল।

লোকটা পকেট থেকে একটা খাম বের করে টেবিলে রাখল। “শুনুন এনাম সাহেব, আপনার কৌতূহল আর আপনার প্রফেশনালিজমকে আমরা শ্রদ্ধা করি। কিন্তু মাঝেমধ্যে ব্যক্তিগত আবেগ যখন কাজের মধ্যে ঢুকে পড়ে, তখন সেটা বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়। ইরা নামের মেয়েটার কেসটা আপনি যেভাবে ‘ম্যানেজ’ করেছেন, তাতে আমাদের ওপরের মহলের কিছুটা নজর পড়েছে আপনার ওপর।”
আমি বললাম “আপনার উপরে মহল কে আমি জানিনা তবে তাদের যাই মনে হোক রাত সাড়ে তিনটার সময় আমি আমার নিজের রুমে কোন অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া কারো সাথে দেখা করি না এটা তাদেরকে বলে দিবেন, আর এখন আপনি আসতে পারেন”

আমি খামটা হাতে নিলাম না। “আমি কোনো আবেগ দিয়ে কাজ করি না। আমি যা করি, তা লজিক্যাল কনক্লুশন।”

“হয়তো।” লোকটা উঠে দাঁড়াল। “তবে মনে রাখবেন, ঢাকা শহরটা খুব ছোট। কুয়াশাচ্ছন্ন জঙ্গলেও কিন্তু পায়ের ছাপ থেকে যায়। আপনার ওই ইন্টার্ন ডাক্তার বান্ধবীটি যদি বেশি প্রশ্ন করতে শুরু করে, তবে সেটা আপনার এবং তার দুজনের জন্যই ভালো হবে না। এবং আমি ও আমার উপর মহল চাইনা যে আপনি বা আপনার বান্ধবী কোন ঝামেলায় পড়ুন”

আমি বললাম “আপনি যে আমাদের উপর আড়ি পাচ্ছিলেন সেটা আমি জানতাম”

লোকটা আমাকে প্রশ্ন করল ”কিভাবে”
আমি লোকটা কে বললাম ”আমি আপনার সব প্রশ্নের উত্তর কেন, কোন প্রশ্নের উত্তর দিতেই বাধ্য নই”

লোকটা লোকটা সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো, তখন আমি বললাম “তবে আমার ও আমার বান্ধবীর ব্যাপারে এতটা খেয়াল রাখার জন্য কৃতজ্ঞতা স্বরূপ আমি আপনাকে এতোটুকু বলতে পারি যে বাউনিয়া এলাকায় যেখানে আমি বিমানের ছবি তুলছিলাম সেখানে কালো টিনটেড গ্লাসওয়ালা লেটেস্ট মডেলের অডি গাড়িতে সুট-বুট পরে প্রায় ঘন্টাখানেক যাবত কেউ গাড়ির ভেতরে বসে থাকে না, আর আপনাদের হয়তো মাথায় ছিল না যে আপনাদের গাড়ির উইন্ডোগুলো টিন্টেড হলেও উইন্ডশিল্ডটা সচ্ছ। আর আমি যেহেতু বিমানের ফটোগ্রাফি করতে গিয়েছিলাম সেহেতু খুবই স্বাভাবিক যে আমার ক্যামেরায় জুম লেন্স লাগানো ছিল। পরেরবার এই বিষয়গুলো মাথায় রাখবেন এগুলো কিন্তু খুবই আনপ্রফেশনালিজম”

লোকটা চলে গেল। আমি আবার একা। রুমে পিনপতন নীরবতা।

আমি কম্পিউটারটা অন করলাম। একটা বিশেষ ফোল্ডার খুললাম। সেখানে কয়েকটা ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইট ছবি। কোনোটা একটা ট্রাকের চাকার, কোনোটা একটা নির্জন হাইওয়ের। একটা ফাইলে লেখা— ‘Operation: Cold Justice’। আমি ফাইল টি পার্মানেন্টলি ডিলিট করে দিলাম 

আমি কি সত্যি আবেগহীন? যদি তাই হতো, তবে ইরাকে দেখার পর ওই ট্রাক ড্রাইভারের সাথে আমার কেন দেখা করার প্রয়োজন হতো? কেন আমি ওই শিক্ষকের লোকেশন ট্র্যাক করার জন্য ডার্ক ওয়েবে তিন ঘণ্টা সময় নষ্ট করলাম?

মোবাইলের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। নওরীনের মেসেজ— “ঘুমিয়েছ? কাল সকালে আসছি তোমার ওখানে। কথা আছে।”

আমি রিপ্লাই দিলাম না। আমি বারান্দায় গিয়ে আরেকটা সিগারেট ধরালাম, মূলত সিগারেটের খাওয়ার সময় কারো সাথে কথা বললে জিনিসটার প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যায় না। দূরে শীতলক্ষা নদীর ওপর ভোরের কুয়াশা জমতে শুরু করেছে।

আমি আবার ডেল্টা ফোর্স গেমটা স্টার্ট করলাম। কিন্তু এবার টার্গেটগুলো আর আর জাস্ট টার্গেট বলে মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে রক্ত-মাংসের মানুষ। আমার এই ডার্ক রুমের ভেতরেও যেন কারো নিশ্বাস শুনতে পাচ্ছি।

ইরা কি এখনও এখানে আছে? তারপর আমি নিজেই ভাবলাম সে থাকলেই কি আর না থাকলেই বা কি। That chapter has, for me, been irrevocably consigned to the past.



সকাল ০৬:১৫ মিনিট। ভোরের আলো ফুটেছে শীতলক্ষার বুকে, কিন্তু আমার এই Musou Black রুমে বাইরের কোনো উজ্জ্বলতার প্রবেশাধিকার নেই। শহীদুল ইসলাম লোকটা আসলে যতটা না আনাড়ি, তার চেয়ে বেশি সাবধানী ছিল। সে শত্রু নয়, সেটা আমি জানি। সে আসলে এক ধরণের 'অ্যালার্ম ঘড়ি', যারা সময়মতো এসে জানান দিয়ে যায় যে জগতের ভারসাম্য একটু নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। সে যে সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল নিয়ে এসেছিল, সেটা ভয় দেখানোর জন্য নয়, বরং সেটা তার এই অন্ধকার প্রফেশনের একটা অলিখিত ড্রেস কোড।

আমি শাওয়ার নিয়ে এক কাপ কড়া ব্ল্যাক কফি বানিয়ে জানালার দিকে তাকালাম। নওরীনের মেসেজটার কথা মনে পড়ল। নওরীন আসছে। সে হয়তো বিপদে পড়তে পারে, কিন্তু সেই সম্ভাবনা দশ শতাংশের বেশি নয়। তবে ওই দশ শতাংশই আমার জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারতো, যদি না আমি এনাম হতাম।



দরজায় নক পড়ল। সেই চেনা ছন্দ, সেই চেনা রিদম। আমি দরজা খুললাম।

নওরীন দাঁড়িয়ে আছে। চোখে ক্লান্তির চেয়েও বেশি এক ধরণের উত্তেজনা। তার হাতে একটা সাদা রঙের ফাইল। সে রুমে ঢুকেই সরাসরি সোফায় গিয়ে বসল।

“এনাম, তুমি জানো এই ফাইলটাতে কী আছে?” সে হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করল।

আমি কফির মগটা হাতে নিয়ে তার মুখোমুখি বসলাম। “আমি তো আর গণক নই নওরীন। বলে ফেলো।”

নওরীন ফাইলটা টেবিলের ওপর রাখল। “প্রফেসর রশিদের মানে ওই শিক্ষক যে রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছেন, তার মেডিক্যাল রেকর্ডস। ওই হাসপাতালে আমার একজন বান্ধবী আছে তার মাধ্যমে আমি হসপিটালের আর্কাইভ থেকে বের করেছি। উনি মারা যাওয়ার ঠিক একদিন আগে উনার কাছে একটা চিঠি এসেছিল। চিঠিটা ওনার ফাইল-এর ভেতর ছিল, পুলিশ হয়তো সেটা খেয়াল করেনি বা ধর্তব্যে নেয়নি।”

আমি লজিক্যাল গ্যালারিতে চোখ বুলালাম। শহীদুল কেন এসেছিল, সেটা এবার পরিষ্কার হতে শুরু করল। “চিঠিতে কী লেখা ছিল?”

নওরীন ফাইলের ভেতর থেকে একটা ফটোকপি বের করল। সেখানে মাত্র একটা লাইন লেখা  ‘The sixth fail is the final one.’

আমার একটু চিন্তার জগতে প্রবেশ করলাম। ইরাকে ওই প্রফেসর ছয়বার ফেল করিয়েছিলেন। আর এই ষষ্ঠবারই ছিল ইরার শেষ। আসলে প্রফেসরের মৃত্যুটা কোনো র‍্যান্ডম অ্যাক্সিডেন্ট ছিল না, বরং সেটা ছিল একটা পরিকল্পিত জাস্টিস।

নওরীন আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল। “এনাম, আমি জানি তুমি বলবে তুমি বাসায় ছিলে, গেম খেলছিলে। কিন্তু এই চিঠির ভাষা, এই কাজ করার ধরন... এটা কোনো সাধারণ মানুষের কাজ নয়। এটা এমন কারো কাজ, যে সিস্টেমের বাইরে গিয়ে বিচার করতে জানে। তুমি কি আমাকে সবটা বলবে?”

আমি কফির শেষ চুমুকটা দিয়ে বললাম, “নওরীন, তুমি এখন একটা বিপজ্জনক কৌতূহলের শিকার হচ্ছো। এই ফাইলটা পুড়িয়ে ফেলো। প্রফেসরের বিচার হয়েছে, ইরা হয়তো শান্তি পেয়েছে ব্যস।”

“কিন্তু তুমি কেন এর মধ্যে?” নওরীন জেদ ধরল।

আমি হালকা হাসলাম। “আমি এর মধ্যে নেই নওরীন। আমি শুধু একজন দর্শক।”

নওরীন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর ফাইলটা গুছিয়ে উঠে দাঁড়াল। “আমি জানি তুমি অনেক কিছু লুকাচ্ছ। কিন্তু মনে রেখো এনাম, কুয়াশাচ্ছন্ন জঙ্গলে কিন্তু শিকারিও মাঝে মাঝে হারিয়ে যায়।”

সে চলে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে এগোল। দরজার কাছে গিয়ে থেমে আবার ফিরে তাকাল। “আজ রাতে কি তোমার রুমে অন্য কেউ এসে ছিল? আমার কেন জানি মনে হলো”

আমি কোনো উত্তর দিলাম ”না”। নওরীন চলে গেল। (মেয়েটা আমাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে)

আমি দরজা বন্ধ করে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। কুয়াশা এখন পুরোপুরি কেটে গেছে। নদীর ওপার থেকে আসা রোদে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। শহীদুল শত্রুর নয়, নওরীন বিপদে নেই তাহলে এই অস্বস্তিটা কোথায়?

হঠাৎ মনে হলো, আমার পকেটে রাখা মোবাইলটা ভাইব্রেট করছে। বের করে দেখলাম একটা নোটিফিকেশন। আমার বাউনিয়ায় তোলা সেই ডিজিটাল ফটোগুলোর ক্লাউড সিঙ্ক শেষ হয়েছে।

আমার ডার্ক রুমে আবার সেই নিস্তব্ধতা ফিরে এল। ওলেড প্যানেলে ডেল্টা ফোর্সের ম্যাপটা তখনো টিমটিম করছে।

আমি আবার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। শীতলক্ষ্যার বুকে দু-একটা মালবাহী ট্রলার চলছে। নদীর পানি সকালে রোদে রুপালি মনে হলেও গভীরে ওটা ঘন কালো। আমার জীবনটাও বোধহয় তেমনই বাইরে থেকে যতটা শান্ত এবং লজিক্যাল মনে হয়, ভেতরে ততটাই অন্ধকার আর অমীমাংসিত।

হঠাৎ আমার মনে হলো, আমার ফ্ল্যাটের নিচের পার্কিং লটে কিছু একটা নড়াচড়া করছে। আমার এই ডার্ক রুমের জানলা থেকে নিচের দৃশ্যটা খুব একটা পরিষ্কার নয়, তবুও আমার ‘নাইট ভিশন’ লেন্স লাগানো বাইনোকুলারটা বের করলাম। পার্কিং লটে আমার কালো BMW M5-এর ঠিক পাশেই একটা সাদা রঙের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ওটা কোনো সরকারি গাড়ি নয়, আবার নওরীনেরও নয়। গাড়ির জানলাগুলো সম্পূর্ণ কালো।

আমি বাইনোকুলারটা নামিয়ে রাখলাম। শহীদুল কি তবে এখনও নজরদারি চালাচ্ছে? সে বলেছিল তারা চায় না আমি বা আমার বান্ধবী কোনো সমস্যায় পড়ি। কিন্তু তাদের এই ‘পাওয়া না পাওয়ার’ সংজ্ঞার মাঝে আমি ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?

আমি ড্রয়ার থেকে আমার সেকেন্ডারি ফোনটা বের করলাম। এটা আমি কেবল ডার্ক ওয়েব এক্সেস করার জন্য ব্যবহার করি। ফোনের স্ক্রিনটা নীলচে আলো ছড়িয়ে জ্বলে উঠল। গত দুদিন ধরে আমি একটা নাম সার্চ করছি ‘শহীদুল ইসলাম’। অবশ্য জানতাম এই নামে তাকে পাওয়া যাবে না। কিন্তু আমি তার ছবির ওপর ভিত্তি করে ফেশিয়াল রিকগনিশন সফটওয়্যার চালিয়েছিলাম।

রিজাল্ট এল— Match Not Found in Public Database.

তার মানে সে এই দেশের সিস্টেমের ভেতরে নেই।

আমি হঠাৎ মৃতদের দেখা কেন শুরু করলাম ?

মাথার ভেতরটা ঝিমঝিম করছে। আমি ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানি বের করে চোখেমুখে ছিটালাম। আয়নায় নিজের মুখটা দেখলাম একটু মুচকি হাসলাম এখন আমার কাছে ব্যাপারটা বেশ রোমাঞ্চকর মনে হচ্ছে।

আমি আবার ডেল্টা ফোর্স গেমটার দিকে তাকালাম। স্ক্রিনে ম্যাপটা তখনো স্থির। আমার মনে হলো, এই গেমের পিক্সেলগুলো আসলে আমার চারপাশের মানুষের জীবন। কে কখন মরবে, কার ওপর দিয়ে ট্রাক চলবে সবই যেন আগে থেকে প্রোগ্রাম করা।

আমি কম্পিউটারে গিয়ে বসলাম এবং বাউনিয়ার সেই ছবিটা আবার পরীক্ষা করতে শুরু করলাম। ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা বিলবোর্ড দেখা যাচ্ছে, যেখানে একটা অস্পষ্ট লেখা আছে। আমি ইমেজ এনহ্যান্সার সফটওয়্যার দিয়ে ওটা পড়ার চেষ্টা করলাম। সেখানে লেখা ‘The end is just another beginning.’

আমি শব্দ করে হাসলাম। এটা কোনো কো-ইন্সিডেন্স হতে পারে না। “ইরা, তুমি কি শুনছ?” আমি শূন্য ঘরের দিকে তাকিয়ে বললাম। “পরবর্তী মিশনটা কি তোমার জন্য? নাকি আমার জন্য?”

রুমের এসিটার টেম্পারেচার হুট করে বিপ শব্দ করে বেশটা কমে গেল। রুমটা আরও অন্ধকার হয়ে এল। আমার ডার্ক রুমের সেই Musou Black দেওয়ালে মনে হলো কোনো একটা ছায়া নড়ে উঠল।

আমি আর ভয় পেলাম না। ভয় আবেগহীন মানুষের জন্য নয়। আমি শুধু কৌতূহলী হয়ে পরের চালে মনোযোগ দিলাম। নওরীন হয়তো আবার আসবে কাল সকালে। সে হয়তো আরও কিছু নিয়ে আসবে। সে হয়তো মনে করছে সে আমাকে বাঁচাতে আসছে, কিন্তু সে জানে না সে নিজেই এই কুয়াশাচ্ছন্ন জঙ্গলের আরও গভীরে ঢুকে পড়ছে।

আমি সোফায় হেলান দিয়ে বসলাম। ডার্ক রুমের ভেতরে যেন এক নতুন ডাইমেনশন খুলতে শুরু করেছে।



চলবে....

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ