ফ্রীল্যান্সার ( পর্ব -১ )


 ” রাত ০১টা :৩৭ মিনিট: ৫৩ সেকেন্ড ” আপনাদের কাছে এটা একটা সময়। মানে গভীর রাত- তাইনা? কিন্তু আমার কাছে তা নয়। আমার কাছে এটি অনন্তকাল ধরে বৃত্তাকার পথে চলতে থাকা কিছু সংখ্যার লুপ। যার অর্ধেক দিন আর অর্ধেক রাত। কিন্তু আমার কাছে এই অনন্তকাল ধরে চলে আসা সময়বৃত্তটা বড় একঘেয়ে হয়ে গিয়েছিলো। অসহ্য অস্থিরতা কাজ করতো আমার মধ্যে। তখন একটা সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি এই সময়ের কনসেপ্টটাকে ভিন্ন ভাবে অনুভব করার জন্য আমার রুমটা সম্পূর্ন  Musou Black নামক এক বিশেষ পেইন্টের আবরণ দিয়ে ঢেকে দিয়েছি। যা আলোর ৯৯.৪% অ্যাবর্জব করে নেয়। সিলিং থেকে নেমে এসেছে একটা সাদা রং এর বৈদুতিক আলো সেটা দেখতে অনেকটা সিনেমায় দেখানো ইন্টারোগেশন রুমের বাতির মতো। রুমে কম্পিউটার ও আরো যেসব সামগ্রী আছে সবই পিওর ননরিফ্লেকটিভ ব্লাক কালারের। আর তাছাড়া কম্পিউটার যখন সচল থাকে OLED প্যানেলের কারনে বিশেষ আলোক দূষণ ঘটায়না।


এই  কালোর সাথে আমার যে অবসেশনের কথা বর্নণা করলাম তার কারন হিসেবে কিন্তু ধরে নেবেন না যে আমার প্রিয় রং কালো। একদমই না, আমার প্রীয় রং লীল। আর এই কালো রং ব্যাবহারের কারন হলো এটা একটা ইনফিনিট স্পেসের অনুভূতি দেয় আর সাথে সাথে সাউন্ডপ্রুফ হওয়ার কারনে ওই ঘরটা অন্য একটা জগৎ তৈরী করে। আমি ওই জগৎটাতে থাকতেই বেশি পছন্দ করি। ওই জগতে আপনাদের এই ২৪ ঘন্টা সময় আমার এই জগতে কিছু ডিজিটের কম্বিনেশন মাত্র। আপনারা ভাবতে পারেন এইলোক অধিকাংশ সময় ওই জগতে বসবাস করলে কাজ করে কোন সময়? 


হ্যা কাজ আমি করি, কিন্তু আর সবার মতো নাইন টু ফাইভ ইয়েস বস ইয়েস বস টাইপ কাজ না। আমার কাজ গুলো সবসময়ই থাকে রাতে, মানে আমি সময়টা সেভাবেই ঠিক করে নেই। আর সব সময় কাজ থাকেও না তখন আমি উন্মুক্ত। আপনারা আমাকে ফ্রিল্যান্সার বলতে পারেন। আমার গাড়িটাও খুবি গাড় টিন্টেড গ্লাসের। আমি আসলে ইদানিং আলো ও মানবসৃষ্ট শব্দ অপছন্দ করতে শুরু করেছি। তো এখন আমার এই রহস্য জনক কর্মক্ষেত্র নিয়ে না হয় অন্য কোন সময় আলাপ করা যাবে এমনিতেই অনেক বেশি কথা বলে ফেলেছি। এখন কিছুটা প্রাসঙ্গিক আলোপে ফিরে আসা যাক,


আমার ওই ডার্ক রুমের বিশেষ আর্কিটেকচার ও অ্যটমোস্ফিয়ার আমাকে ভিন্ন একটা ডাইমেনশনের সাথে কানেক্ট করে দিতে শুরু করেছে। আপনারা হয়তো ভাবছেন কোন ডাইমেনশন, কিসের ডাইমেনশন?


আমি মৃত মানুষদের দেখতে পাই।


আমি তাদের সাথে কথা বার্তা বলি, যুক্তি-তর্কও করি। প্রথম প্রথম মনে করতাম এগুলো আমার হ্যালুসিনেসন। তারা আসে। তবে হরর মুভিতে আমারা যেরকম ভাবে দেখি ঠিক সেরকম ভাবে না। তো চলুন শুরু করা যাক, বিষয়টা মজাদার।


তো একদিন রাতে বাড়িতে ফিরলাম এই ৩ টা বেজে ১০ বা ১৫ হবে এমন সময়। ভারী বৃষ্টি হচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো এভাবে সারারাত চললে মিরপুর-১০ এ ছোট দোতালা লঞ্চ ভেড়ানো যাবে। তেমনটা হলেও আমার কোন অসুবিধা নাই কারন আমি থাকি পূর্বাচলে শীতলক্ষা নদীর তীরে একটি নব নির্মিত বহুতল ভবনের টপ ফ্লোরে। এদিকে পানি জমে না।



যথারীতি বলববো না, কারন আপনাদের মোতো কোন কাজই আমি নিয়ম মেনে করি না। গাড়িটা কোন রকম পার্ক করে লিফটের উদ্দেশে হাটা দিলাম। আমি গাড়ি ভালো ভাবে পার্ক করতে পারিনা তা না বরং অধিকাংশ সময় ইচ্ছা করে আর বাকি সময় আলসেমি করে যেভাবে ইচ্ছা বেকা তেড়া করে পার্ক করে আমার ফ্ল্যাটে চলে যাই। পুরো ১০ তলা ভবনটিতে আমি একা থাকি তা নয়। বেশ কয়েকটা সরকারী কর্মকুত্তাও থাকে। কিন্তু কোন একটা অজানা কারন বসত তারা এই অ্যাবনরম্যালি ব্লাক টিন্টেড গ্লাস ওয়ালা কালো  BMW M5 গাড়িটাকে এড়িয়ে চলে। আমি যে লোক হিসেবে খারাপ তা নয়। তবে আমি বিষয়টা উপভোগ করি, তো বাদদেন সে আলাপ। আসল কথায় আসি। রুমে এসে কাপড় বদলে শুয়ে বড়লাম। বাইরে থেকে খেয়েই এসেছিলাম। চোখে তন্দ্রাচ্ছন্ন একটা ভাব এসেছে। হঠাৎ একটা নারী কন্ঠ বেশ স্বাভাবিক ভাবেই বলেলো-


”এনাম সাহেব আজ বুঝি একটু বেশিই ক্লান্ত ?”


আমি সাধারণত যুক্তিদিয়ে চিন্তাকরা অত্যন্ত প্রফেশনাল টাইপের মানুষ। তাই প্রথমেই মাথায় বেশকিছু প্রশ্ন আসলো,

যেমন কে এখানে ? সে কিভাবে আমার রুমে প্রবেশ করল ? এবং তার কন্ঠটা আমার অপরিচিত। সে যাই হোক না কেন, আমার কাছে তাকে কোন সিকিউরিটি থ্রেট বলে মনে হলো না। তবে ঘটনাটা স্বাভাবিক নয়। তবে আমি যে প্রফেশনের লোক, এরকম সিলি একটা সিচুয়েশনে আমি ভোড়কে যাব ব্যাপারটা তেমন ও না। আমার রুমের লাইট গুলো মোবাইল থেকে কন্ট্রোল করা যায়। আমি লাইটটা জ্বালালাম। আমি আগেই বলেছি আমার রুমটা অদ্ভুত আলোক শোষণকারী পেইন্ট দ্বারা আবৃত। তবে সেটুকুই যথেষ্ট ছিল, দেখলাম সাদা অ্যাপ্রন করা একটা মেয়ে আমার কম্পিউটার টেবিলে বসার চেয়ারটা আমার দিকে ঘুরিয়ে সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে বসে আছে, ওকে জিজ্ঞাসা সূচক অভিব্যক্তি।

কোন না কোনভাবে সে আমার রুমে এসে পড়েছে কিন্তু সেটা আমার চিন্তার বিষয় না, আমার চিন্তার বিষয় হল তার উদ্দেশ্যটা কি ?

আমি বেশ স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিলাম ৩ঃ৪৫ বাজতে চলেছে এতদূর গাড়ি চালিয়ে বাসায় এসেছি কিছুটা ক্লান্ত থাকাটাই কি স্বাভাবিক নয়? আপনি কে ? নিচে সিকিউরিটি গার্ড উপরে আমার রুমের লক এতকিছু পার করে ভিতরে আসলেন কি করে? 


সে আমাকে উত্তর দিল- আমি এখন এ সকল পার্থিব বাধাবিপত্তির উর্ধ্বে। তো আপনি কি দেশের খবরাখবর দেখেন না নাকি? তা না হয় বাদাই দিলাম সোশ্যাল মিডিয়া তো ব্যবহার করেন।


আমি জবাব দিলাম হ্যাঁ করি, তবে দেশের খবরাখবর সেভাবে রাখা হয় না। তো সেটার সাথে আপনার সম্পর্ক কি?


সে আমাকে আমার মোবাইলের দিকে ইশারা করে আমাকে বলল কিছুক্ষণ আগে আপনি জানতে চাইলেন না যে আমি কে, ফেসবুক টা অন করে একটু স্ক্রল করুন, উত্তর পেয়ে যাবেন! 



তো মোবাইলটা খুজতে আমার কিছুটা সময় লাগলো, কারন অমার মোবাইল একটা না, যেটা আমার কাছে ছিলো সেটা দিয়ে আমি সোশাল মিডিয়া ব্যাবহার করিনা, আর যেটা দিয়ে করি সেটা আমার প্যান্টের পকেটে ছিলো আর প্যান্টটা ছিলো অন্য রুমে। 


[ আপনারা ভাবছেন আমি আমার বেডরুমে অপরিচিত একটা মেয়েকে দেখেও আমার প্যান্টের পকেটে থাকা মোবাইল খুজছি বিষয়টা আপনাদের কাছে মাত্রতিরিক্ত অস্বাভাবিক মনে হচ্ছেনা ? হওয়ারই কথা! কিন্তু আমি আমার প্রফেশনের দিক থেকে বিবেচনা করে এটা নিয়ে অবাক হচ্ছি যে মেয়েটা এখনো কোন অস্ত্র বের করেনি কেন ? বাদ দেন এখানে আমার আমার প্রফেশন নিয়ে ডিসকাস করতে বসিনি। তবে আমাকে মাসুদ রানা বা জেমস বন্ড টাইপের ক্যারেকটার হিসেবে কল্পনা করবেন না। ওসব সিনেমাতে হয়। আমি ফ্রীল্যান্সার ]


আচ্ছা মোবাইলটা নিয়ে আবার বেডরুমে প্রবেশ করার সময় দেখলাম মেয়েটার চোখে পানি। অবশ্য সেটা এখন আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় না।


আসলেই বেশি সময় লাগলো না। ফেইসবুক খুলে সামান্য স্ক্রল করেই মেয়েটার পরিচয় পেলাম এবং ঘটনার পূর্বের অংশ আমার কাছে পরিষ্কার হলো আর এখন আমার সাথে যা ঘটছে তা মনে হচ্ছে অবাস্তব। অবশ্য অবাস্তবতার যে খেয়ালটা মাথায় এসেছিলো তা বেশিক্ষন থাকলোনা, আজকাল কার ফেইসবুকের নিউজের কোন গ্রহনযোগ্যতা নেই আমার কাছে।


নিউজটার সারমর্ম আপনাদের বলি,

মেয়েটার নাম ইরা, একটি সরকারী মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। একটি পরীক্ষায় একজন নিদৃষ্ট পরীক্ষক তাকে বিশেষ কোন কারণবসত পর পর ৬ বার একই পরীক্ষায় ফেইল করিয়ে দেয় যার পরিপ্রেক্ষীতে ইরা আত্মহত্যার পথ বেচে নেয়।


মোবাইল থেকে চোখটা তুলে ইরার দিকে তাকাতেই দেখি সে সেখানে নেই। সেখানে কেন পুরো ফ্ল্যাটেই আমি ছাড়া কেউ নেই। আমি বিষয়টাকে মস্তিষ্কের এক কোনায় রেখে দিলাম পরে ভাববো বলে। আমি আবার বিছানায় ঘুমাতে গেলাম, কিন্তু সাথে সাথেই আমার চোখে নওরিনের চেহারাটা ভেসে উঠলো। সে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইনটার্ন ডাক্তার। তার সাথে একটা সম্পর্ক আছে আমার তবে সম্পর্কটার নাম জানিনা, ভালোবাসা? তা কি করে হয় আমার তো আবেগ অনুভুতি নেই। যাক সে কথা। তার সাথে আমার পরিচয়ের ঘটনাটাও বেশ অদ্ভুত, পরে এক সময় বলবো আপনাদেরকে। হতাশ হওয়ার কোন কারন নেই আপনাদেরকে অবশ্যই জানাবো, জানানোর জন্যই তো লিখছি তাইনা ?


 আমার চিন্তার গরু চরতে শুরু করলো, এই ইরা মেয়েটা কিছুদিন পরেই ডাক্তার হয়ে বের হতো। জানিনা কয়টা অটোপ্যাসির পর্যবেক্ষন করেছে এই মেয়েটা। আচ্ছা এটাতো আত্মহত্যার কেইস, এই মেয়েটারও অটোপ্যাসি করা হবে হয়তো ওরই মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, হয়তো এই অটোপ্যাসি সুপারভাইস করবে ওই পরীক্ষক ওরই জুনিয়ররা হতে পারে ক্লাসমেটরাও হয়তো সেটা পর্যবেক্ষন করবে……

নাহ্ আর চিন্তা করতে পারছিনা। শালার বিজ্ঞানের কাছে মানুষের মৃতদেহটা জাস্ট একটা সাবজেক্ট আর আমাদের দেশের এই অটোপ্যাসি সম্পর্কিত টেকনোলজির কথা আর নাই বা বললাম! আর এসব কিসের জন্য? আইন ! এই দেশের অন্ধ আইনরে আমি *** ! 


ঘুম আর হবেনা, বেডরুমের লাইট টা জ্বালাতেই দেখি ইরা দাড়িয়ে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। না, ওইসব হরর মুভির মতো না। খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি একটু চমকে যাইনি তা কিন্তু না। ( তবে পরিবেশটা অদ্ভুত, আমার রুমের রং এর কথা আপনাদের আগেই বলেছি। আলো প্রতিফলিত হওয়ার মতো তেমন কিছুই নেই এখানে। ১৭’ ডিগ্রিতে এ.সি চলছে, রুমে পিনড্রপ সাইলেন্স। এর মধ্যে দৃশ্যমান আমরা দুটো মানুষ, আসলেই কি দুটো মানুষ ? নাকি একটা মানুষ আর একটা চেতনা ? যাইহোক সেটা নিয়ে অন্য সময় ভাবা যাবে। আমি ইরাকে বসতে বললাম )


ইরা বলল - কি হলো, ঘুম আসছেনা?

আমি- আমি আশা করেছিলাম উত্তরটা আপনার জানা থাকবে, সম্ভাবত জানা আছেও তাই এধরনের প্রশ্ন করে আমাকে বিরক্ত করবেন না।



ইরা- না আপনার ধারনা ভুল। আমি কিভাবে জানবো যে আপনার ঘুম আসছে কি আসছেনা !?


আমি- ঘুম আসছে। কিন্তু আপনি নিশ্চয়ই আমাকে ঘুমাতে দেখার জন্য এখানে আসেননি। আর আমার নার্ভ সম্পর্কে আমার কনফিডেন্স আছে, হ্যালুসিনেট করার মতো লোক আমি না। আপনার উদ্দেশ্য কি?


ইরা- আমার বাবা-মা আর ভাই আমাকে নিতে ওখানে যাচ্ছে। জানেন অনেক লোকজনকে তাদের আত্মীয় স্বজনদের মৃতদেহ বুঝে নেওয়ার জন্য হাসপাতালের মর্গের সামনে কখনো আহাজারী করতে আবার কখনো নিশ্চুপ বসে থাকতে দেখেছি। জানেন, মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম দিন আমার বাবা-মা’ই আমাকে হলে রেখে আসতে গিয়েছিলেন। কত আনন্দিত ছিলেন উনারা সেদিন, অবশ্য রেখে আসার সময় মা কাঁদছিলেন আর বলছিলেন ”এইযে মেয়েটা বাড়ি থেকে চলে আসলো, আর কোন দিন আগের মতো করে বাড়িতে ফিরবে না!” আমি কথাটার মর্ম সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম। তবে এভাবে নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে শেষবারের মতো লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়িতে ফিরতে হবে তা তো তখন জানতাম না। আমি তো মেয়ে, একটা সময়ের পর আমাদের নিজ ঠিকানা চিরতরে বদলে যায়। আমরা আমাদের বাবার বাড়িতে জীবনের শেষ যাত্রা করিনা। মর্গে আমার শরীরের সাথে কি হবে তাতো আমার ভালো করেই জানা। কিন্তু আমার পরিবার ওই অবস্থায় আমাকে কিভাবে বুঝে নিবে ? তারা তো আমাকে ওই অবস্থায় রেখে যাননি। পরিবারের ছোট মেয়ে আমি, আমার সামান্য আঘাত যারা সহ্য করতে পারতেন না তারা কিভাবে…..আমি কল্পনাও করতে পারছিনা!


আমি কম্পিউটারটা অন করলাম, রুমে স্মোকিং এর জন্য একটা শক্তিশালী এগজাস্ট ভেন্ট আছে সেটা চালু করে একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে জিজ্ঞস করলাম- চেতনার কল্পনাশক্তিও থাকে?


ইরা মনে হয় কিছুটা চমকে গেল। কিছুটা করুন ভাবে আমার দিকে তাকালো। সম্ভাবত আমার প্রশ্নটাকে তার কাছে উপহাস বলে মনে হলো। কিন্তু আমার আবেগ-অনুভুতি নেই। আমি উপহাস, ঠাট্টা, বিদ্রুপ করতে পারিনা। আমার আছে কৌতুহল, আর সেই কৌতুহল থেকেই আমি প্রশ্নটা করেছি। রোজ রোজ তো আমাকে এরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হয়না। আমি তো ওঝা না। আচ্ছা “ওঝা ভদ্র ভাষায় Exorcist” দের কি কখনো এরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হয় ? আচ্ছা চিন্তা করার জন্য আরেকটা টপিক পাওয়া গেল। আমি একটা নোটবুকে প্রশ্নটা টুকে রাখলাম। আর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য বললাম;


আমি- আমি আপনাকে প্রশ্নটা আমার কৌতুহল থেকে করেছি। যদিও সেটা এখন আপনার নিবারণ করার বিশেষ প্রয়োজন নেই। আপাতত এটা বলুন যে এ সবই যখন জানতেন তখন এই পদক্ষেপ নিলেন কেন ?


ইরা- যখন এই কাজ করছিলাম বা করতে যাচ্ছিলাম তখন আমি আফটারম্যাথ নিয়ে ভাবিনি। না, ভাবিনি বললে ভুল হবে এরকমটা ভাবিনি। নিজেকে খুব মুল্যহীন মনে হচ্ছিলো মনে হচ্ছিলো যে আমি পারবোনা। আর আমার ওই শিক্ষকের ওপর প্রচন্ড ক্ষোভ জন্ম নিয়েছিলো যেটা এখণ আরো তীব্র হয়েছে। মনে হচ্ছিলো সে প্রচন্ড ক্ষমতাশালী সে যা ইচ্ছা করতে পারে আর আমি? আমার নতি স্বীকার করা ছাড়া কিছুই করার নেই। নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হচ্ছিলো। আর সবচেয়ে বড় কথা তখন আমার এই সিদ্ধান্তকে মনে হচ্ছিলো এটা জীবন থেকে একটা Pause যা থেকে জীবনটা আবার আগের মতো শুরু করা যাবে। আমার তখন এটাকে চুড়ান্ত শেষ বলে মনে হয়নি। এটাকে নিজের অভিমান প্রকাশের একটা মাধ্যম বলে মনে হচ্ছিলো তখন। শেষ মুহুর্তেও মনে হচ্ছিলো গভীর ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছি, হয়তো তিন চারদিন পর আবার ঘুম ভাঙবে। আবার ক্যাম্পাসে যাবো, ক্যান্টিনে যাবো, বন্ধু বান্ধবের সাথে আড্ডা দিবো রাতে রুমমেটের সাথে গল্প করবো ! কিন্ত এখন সব শেষ! যেকোন মুল্যেও আমি আর কোন দিন এসব করতে পারবো না! আচ্ছা এনাম সাহেব কবর কি খুব অন্ধকার?


আমি- আমাকে তো কবর দেওয়া হয়নি তাই অথেনটিক ইনফরমেশন দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না, তবে  আপনি যখন প্রথম আমার রুমে এসেছিলেন এই রুমটা যেরকম অন্ধকার ছিলো অনেকটা সেরকমই হওয়ার কথা। আচ্ছা আপনি আমাকে চিনেন কিভাবে? আমার কাছে আসার উদ্দেশ্য কি? আমি আপনার জন্য কি করতে পারি?


ইরা- আমি অপনার একজন নিয়মিত পাঠক, সেখান থেকেই আপনাকে চিনি। আপনি হয়তো আমার জন্য কিছু করতে পারবেন বলে আমি মনে করি। এনাম সাহেব আমি ওই লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়িতে বাড়ি ফিরতে চাইনা আমি চাইনা ওই মাতাল জগন্য লোকটা আমার মৃতদেহ স্পর্শকরুক!


আমি বললাম- মিডিয়ায় নিউজটা চলে এসেছে। কাজটা কঠিন হবে, কিন্তু অসম্ভব না। কিন্তু আমিতো টাকা ছাড়া কোন কাজ করি না। আমি কোন চ্যরিটি চালাই না।


ইরা অবাক হয়ে কিছুক্ষন আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। তারপর বললো আপনি আমার বাবা নম্বর নিন। আপনার যা পেমেন্ট উনি করে দিবেন।


আমি ইরার বাবার নম্বর ডায়াল কতে করতে অন্য রুমে চলে গেলাম। এবং উনাকে বললাম যে যে ইরার মৃতদেহ যদি তার অক্ষত পেতে চায় তাহলে যেন উনারা যতদুর এসেছে সেখান থেকেই ফেরত চলেযায়। মৃত দেহ বুঝে নেওয়ার জন্য যেন শুধু তার ভাই আসে। এবং আমাকে এই ব্যাপারে কোন প্রশ্ন না করে।


আমি ইরাকে বললাম আপনি এখন লিখতে পারবেন?

ইরা- পারবোনা কেন ?


তাহলে বসুন, আমি চেঞ্জ করে আসছি। বেরুতে হবে।


তো আমি চেঞ্জ করে এসে ইরাকে বললাম চলুন আপনাকে দেশের আইন ব্যাবস্থা দেখাই।


গেলাম আমার এক পরিচিত অ্যাডভোকেটের কাছে। আরতার কাছ থেকে সংগ্রহ করলাম ম্যাজিস্ট্রেটের সাক্ষর ও সিল সহ একটা ব্ল্যাংক কাগজ, ওউ হলফনামা না ঘোাষনা টাইপ কি যেন বলে ওটাকে। তারপর চলে গেলাম হাতিরঝিলে ওখানে গিয়ে আমি ইরাকে বলললাম আমি ডিকটেশন দিচ্ছি আপনি লিখুন। 

 ইরা লেখ সিগনেচার করে দিলো।


লিখাটার সার সংক্ষেপ এক লাইনে বলি যে “ আমার মৃত্যু যেভাবেই হোক। আমার মৃতদেহেরে যেন ময়না তদন্ত না করা হয় “ এই টাইপ আর কি।


তারপর আর কি, ইরাকে  নিয়ে কুত্তার মতো গাড়ি ছুটালাম ওর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দিকে ততক্ষন সকাল হয়ে গিয়েছে ওর কলেজে পৌছাতে পৌছাতে দুপুর হয়ে গেল।


ইরার ভাইটা খুব কাজের। আমার কথামতো বেশ ভালেই ঝামেলা পকিয়েছে যে পরিবার ইরার ময়না তদন্ত করতে দিবেনা কোনভাবেই আর মামলাও করবেনা কিন্তু পুলিশ এরকম একটা সেনসিটিভ বিষয়ে অনিশ্চয়তার পথ টা ঠিক নিতে চাচ্ছেনা। তবে ইরার বাবা-মা আমার কথা মানেন নি। তারা এসেছেন।


আমি গাড়িটা একটু আড়ালেই পার্ক করলাম। তার পর ভিড়ের মধ্যে আলগোছে ওই কাগজটা ওর ভাইয়ের হাতে দিয়ে দিলাম। সে সেটার কপি করে এক কপি মেডিকেল কলেজ কতৃপক্ষকে দিলো, এক কপি নিজের কাছে রাখলো আর মুলকপিটা পুলিশের কাছে দিলো। পুলিশের মেনে নেওয়া ছাড়া আর কিই বা করার ছিলো। ম্যাজিস্টেরটের সিল সহ সিগনেচোর করা কাগজ।


তো ময়না তদন্তের বিষয়টা মিটানো গেল। বাকি আছে দুইটা কাজ, প্রথমটা ইরার মৃতদেহ তার নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া আর দ্বিতীয়টা হলো বিচার। এখন বিচার চাওয়ার বিষয়টা তো আগেই নাকচ করে দেওয়া হয়েছে তাহলেকি বিচার পাবেনা মেয়েটা? তার আমি কি জানি !


কিছুক্ষন পরেই একটা লাশবাহী ফ্রীজিং গাড়ি এসে প্রবেশ করলো। এটাকেও আমিই ডেকেছি!


আমি আমার গাড়িতে হেলান দিয়ে তিন বোতল অ্যান্টিটাসিভ আর দুই পাতা সিডেটিভ পেটে চালান করে  সিগারেট টানছি এমন সময় ইরা আমার কাছে এসে দাড়ালো। বোতল আর সিডেটিভের পাতা পাশেই পড়ে ছিলো। ও গুলো দেখে বললো;


ইরা- এগুলো আপনি একসাথে এখন খেয়েছেন?

আমি- হুম। কেন ?


ইরা- কি করছেন এসব? মারা জাবেন এভাবে চলতে থাকলে!

আমি- তাতে কার কি আসে যায়? এমনকি আমার নিজেরও কিছু আসে যায় না। তাছাড়া আমাকে ফ্রীতে উপদেশ দিবেন না।


ইরা তখন বললো আপনার কাজ তো শেষ, আব্বু এখনো পেমেন্ট ক্লিয়ার করেনি বলে দাড়িয়ে আছেন? কি একটা অসুবিধা আমিতো আব্বুকে বলতেও পারছিনা।


আমি সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে কিছুক্ষন ইরার দিকে তাকিয়ে থাকলাম, তারপর সিগারেটটা ফেলে ওর দিকে তাকিয়ে বললাম “ স্টুপিড “ । আর মর্গের ইনচার্জ আর লাশবাহী গাড়ির ড্রাইভার কথা বলছিল যে গোসল ছাড়া লাশ সে গাড়িতে কিভাবে নিবে?


আমি ধমক দিয়ে ড্রাইভারকে বললাম তুই এখানে মুর্তির মতো দাড়িয়ে থাকবি। লোক আসছে ওরা কাজ করবে। আর ইনচার্জ সাহেব আপনার নাম কি ?

 ইনচার্জ- স্যার, মুকুল।


হ্যা মুকুল সাহেব আমার সাথে আসুন।

তো মুকুলকে বললাম চারজন লোক একটা কাঠের খালি কফিন মর্গে ঢুকাবে আবার সেই খালি কফিন বের করে নিয়ে লাশবাহী গাড়িতে তুলবে। আর মৃতের আত্মীয়রা এটাই দেখবে যে লাশ ওই গাড়িতে গেল।


মুকুল- তাহলে লাশের কি হইবো ?


ওই গাড়ি বেরিয়ে যাওয়া কিছুক্ষন পর লাশ আমি নিয়ে যাবো। বেশি বুঝার দরকার নাই যেটা বলছি সেটাই করবে।


মুকুল- স্যার, আমার কোন সমস্যা হইবো না তো ?


আমি যেভাবে বলছি সেভাবে করলে হবেনা। আর হ্যা, নিজে কোন বুদ্ধি খাটাবানা একদম।


তো সে কিছুটা অনিচ্ছা স্বত্বেও রাজি হলো।



খালি কফিন মর্গে ঢোকানো আর লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়িতে তোলার নাটকটা আমি একটা সিগারেট টানতে টানতে মঞ্চস্থ হতে দেখলাম, ইরার বন্ধু বান্ধবীরা কাঁদতে কাঁদতে ইরাকে শেষ বিদায় জানালো। সিডেটিভ আর অ্যান্টিটাসিভ কিছুটা ঘোর তৈরী করতে করতে শুরু করেছে। অ্যাম্বুলেন্সটা বেরিয়ে গেল ইরার বাড়ির উদ্দেশ্যে। একটা ছেলে অ্যাম্বুলেন্স যাওয়ার পরও অনেকক্ষন তাকিয়ে থাকলো অ্যাম্বুলেন্সের যাত্রা পথেরে দিকে। ইরা ছেলেটার পাশেই দাড়িয়ে ছিলো, ছেলেটা ইরাকে দেখতে পারছিলোনা ঠিকই তবে আমি হলফ করে বলতে পারবো সে ইরাকে অনুভব করতে পারছিলো। তারপর ইরাও আমার দিকে হাটতে হাটতে আসতে লাগলো আর ওই ছেলেটাও একহাত দিয়ে চশমাটা খুলে নিয়ে অন্যহাত দিয়ে চোখ মুছতে মুছুতে চলে গেল! ও হ্যা, ছেলেটার হাতে একটা ফুল ছিলো, সেটা রাস্তার মাঝখানে পড়ে রইলো । আচ্ছা গল্পটা অন্যরকম হলে খুব কি অসুবিধা হতো? হতো বোধহয় নাহলে অন্যরকম হলোনা কেন?

আমার ঘোর লাগা মাথায় একটা ছন্দ আসলো, ভ্যাপসা গরমের দিনে বৃষ্টির আগে যেমন ঠান্ড বাতাস গায়ে এসে লাগে তেমন ভাবে,


রাস্তার বুকে পড়ে থাকা সেই একমুঠো ফুল,

অপেক্ষার গল্প বলে, নিঃশব্দে ভাঙা ভুল।

যে হাত ছেড়ে গেল, সে তো ফিরবে না আর,

তবুও গন্ধে লেগে আছে শেষ দেখা অমর ভালোবাসার।


ইরা কান্না ভেজা চোখ নিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলো “আপনার পরিকল্পনা কি আসলে ?”


আমি- আপনিই তো বলেছিলেন যে লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়িতে আপনি আপনার বাড়ির উদ্দেশ্যে শেষ যাত্রা করতে চান না। আপনার সামান্য এটুকু ইচ্ছা পুরণ করাই যায়।


তারপর গাড়ি স্টার্ট করতে করতে ইরাকে বললাম চলুন আপনাকে তো নিতে হবে!


গাড়িটা নিয়ে মর্গের সামনে রাখলাম, স্টার্ট বন্ধ করিনি যদিও। বুট, ব্যাকডালা বা ডিগি আপনারা যে যাই বলেন সেটা ওপেন করে মুকুল সাহেবের সাথে মর্গে প্রবেশ করলাম। লাশ পচাদূর্গন্ধ, ফরমালিন টাইপের কিছুর ঝাজালো গন্ধ সব মিলিয়ে বিচ্ছিরি অবস্থা। 


মুকল সাহেব আমাকে ইরার মৃতদেহের কাছে নিয়ে গেলো। কি মিষ্টি মেয়েটা মনে হচ্ছে যেন ঘুমিয়ে আছে। মুকুল সাহেব যে স্ট্রেচারটাতে ইরা শুয়ে ছিলো ( লাশ বলত ইচ্ছা করছেনা ) সেটা আমার গাড়ির কছে নিয়ে অসলো আর জিজ্ঞাসা করলো, গাড়িতে তুলে দিবো ?

আমি কিছুক্ষন নিথর ইরার দিকে তাকিয়ে থেকে বললাম;


আমি- মুকুল সাহেব এই মেয়েটাকে কি গাড়ির বুটে তোলা যায় !?
মুকল- মেয়ে কোথায় স্যার, এইডাতো লাশ। আত্মাটা উড়াল দিলে এই মাটির দেহের আর কোন মুল্য থাকে না স্যার। আচ্ছা স্যার, কিছু মনে না করলে একটা প্রশ্ন করি ?


আমি- করেন, তবে আমাকে স্যার ডাকা বন্ধ করেন। ভাই বলবেন। আমি আপনার কোন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা না।

মুকুল- আপনি মাইয়াডারে ভালোবাসতেন?

আমি মুকুলে দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে বললাম, না। আপনি গাড়ির পেছনের দরজাটা খুলনে আনলক করাই আছে। ওকে আমি গাড়িতে তুলছি।

মুকুল- কি বলেন স্যার, সরি ভাই। গোসল না দেওয়া লাশ! আপনারা শিক্ষিত মানুষ অনেক কিছুই মানেন না। এই রিস্ক নেওয়া ঠিক হবেনা।

আমি- মুকুল সাহেব, একটা কথা বলি শোনেন। এই মুহুর্তে আপনার সামনে সবচেয়ে বিপদ জনক বা যাকে ভয় পাওয়া উচিত এমন কিছু বা কেউ থাকলে সেটা হচ্ছি আমি। এই মেযেটার নিথর দেহ না। বুঝলেন?


মুকুল আর কথা না বাড়িয়ে গাড়ির ডান পাশের গেট খুলে দাঁড়ালো। আমি ইরার মৃত দেহটাকে স্পর্শ করেই কিছুটা অবাক হলাম। এতক্ষণে মৃতদেহটা শক্ত হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু ওকে স্ট্রেচার থেকে তুলে যখন গাড়ির পেছনের সিটে শুইয়ে দিলাম মনে হলো জাস্ট ঘুমিয়ে আছে।


তো মুকুল সাহেবকে বিদায় জানিয়ে আমি গাড়িতে ঢুকে স্টিয়ারিং এ বসতেই ঝুম বৃষ্টি নামলো। আমি এই বৃষ্টির মধ্যে হুশ করে বেরিয়ে গেলাম ইরার বাড়ির উদ্দেশ্যে। সাড়ে তিন চার ঘন্টার রাস্তা।


এরই মধ্যে ইরা কখন আমার পাশের সিটে এসে বসে আছে আমি খেয়ালই করিনি। এরা আমাকে জিজ্ঞেস করল তো এটাই আপনার পরিকল্পনা ছিল তাহলে। 

আমি বললাম পরিকল্পনার কথা বাদ দেন, আবহাওয়াটা ইনজয় করেন। আমি গাড়িতে অরিজিৎ সিং এর মিউজিক বাজিয়ে দিলাম।



দেখো আলোয় আলো আকাশ,


দেখো আকাশ তারায় ভরা


দেখো যাওয়ার পথের পাশে ছোটে হাওয়া পাগলপারা।


এত আনন্দ আয়োজন,


সবই বৃথা আমায় ছাড়া।


ভরে থাকুক আমার মুঠো,


দুই চোখে থাকুক ধারা।


এলো সময় রাজার মতো,


হল কাজের হিসেব সারা।


বলে আয় রে ছুটে, আয়রে ত্বরা


হেথা নাইকো মৃত্যু, নাইকো জ্বরা…




বৃষ্টি যেন আকাশ ফুঁড়ে ঝরে পড়ছিল। রাস্তা পিচ্ছিল, দৃশ্যমানতা প্রায় শূন্য। কিন্তু আমি স্পিড কমালাম না। স্পিডোমিটারের কাঁটা ১৪০-এর ওপর উঠে গিয়েছিল। কালো BMW মাঝরাতের শূন্য হাইওয়ে দিয়ে ছুটছিল যেন কোনো অন্ধকার প্রাণী।

পাশের সিটে ইরা চুপচাপ বসে ছিল। তার চোখ সামনের রাস্তায়। মাঝে মাঝে পেছন ফিরে দেখছিল তার নিজের দেহটাকে  যেটা পেছনের সিটে শুয়ে আছে, সাদা কাপড়ে ঢাকা, একদম নিথর।

“এনাম সাহেব… আপনি এত জোরে গাড়ি চালাচ্ছেন কেন?”

তার গলায় সামান্য উদ্বেগ।

আমি সিগারেটে লম্বা একটা টান দিলাম। ধোঁয়াটা গাড়ির ভিতরে ছড়িয়ে পড়ল, কিন্তু ভেন্ট দ্রুত সেটা টেনে নিল।

“কারণ রাস্তা ফাঁকা। আর আমার সময় নষ্ট করার ইচ্ছে নেই।”

ইরা একটু চুপ করে থেকে বলল,

“আপনি কি… আমাকে সত্যি সত্যি বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন?”

“হ্যাঁ। তুমি তো সেটাই চেয়েছিলে।”

“কিন্তু… এভাবে? এই বৃষ্টিতে? এই গতিতে?”

আমি কাঁধ ঝাঁকালাম।

“তুমি মরে গেছ। তোমার দেহটা আর কোনো অনুভূতি পায় না। আর আমার তো আবেগ নেই। তাহলে ভয় পাওয়ার কী আছে?”

ইরা কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে এক ধরনের অদ্ভুত বিস্ময়।

“আপনার সত্যি কোনো ভয় করে না?”

“না।”

আমি সোজা সামনে তাকিয়ে বললাম, “ভয় একটা আবেগ। আমার সেটা নেই। শুধু কৌতূহল আছে। এখন আমার কৌতূহল হচ্ছে তোমার বাবা-মা যখন তোমার দেহটা দেখবে, তখন তাদের মুখের অভিব্যক্তি কেমন হবে। আর তুমি কীভাবে সেটা দেখবে।”

ইরা চুপ করে গেল। তার হাত দুটো অজান্তেই জড়িয়ে গেল।

গাড়ির ইঞ্জিন গর্জন করছিল। বৃষ্টির শব্দ আর টায়ারের পিচ্ছিল আওয়াজ মিলে একটা অদ্ভুত সিম্ফনি তৈরি করছিল। আমি রেডিওটা বন্ধ করে দিলাম। এখন শুধু বৃষ্টি আর গাড়ির শব্দ।

প্রায় চল্লিশ মিনিট পর ইরা আবার কথা বলল। তার গলা অনেকটা ভাঙা।

“এনাম সাহেব… আমার বাড়িতে পৌঁছে কী হবে?”

“তোমার পরিবার তোমার দেহ নেবে। কান্নাকাটি করবে। হয়তো তোমার মা অজ্ঞান হয়ে যাবে। বাবা চুপ করে বসে থাকবে। ভাই হয়তো রাগ করে কিছু ভাঙবে। আর তুমি… তুমি পুরোটা দেখবে।”

ইরা শিউরে উঠল।

“আমি… আমি চাই না ওরা আমাকে ওই অবস্থায় দেখুক।”

“তুমি আগেই বলেছিলে। কিন্তু তুমি যখন আত্মহত্যা করলে, তখন তো এসব ভাবোনি। এখন ভাবছ। দেরি হয়ে গেছে।”

আমার কথাগুলো নির্লিপ্ত, কোনো সান্ত্বনা নেই, কোনো তিরস্কার নেই। শুধু তথ্য।

ইরা অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল,

“আপনি খুব নিষ্ঠুর।”

“না। আমি শুধু সত্য বলছি। আবেগ না থাকলে নিষ্ঠুরতাও থাকে না।”

হাইওয়ে থেকে আমরা একটা সরু গ্রামের রাস্তায় ঢুকে পড়লাম। রাস্তা আরও খারাপ। কিন্তু আমি স্পিড কমালাম না। গাড়িটা কাঁপছিল, পেছনের সিটে ইরার দেহটা একটু একটু নড়ছিল।

ইরা হঠাৎ পেছন ফিরে তাকাল। তার চোখ বড় হয়ে গেল।

“এনাম সাহেব… ওর… ওর চোখটা একটু খুলে গেছে!”

আমি রিয়ার ভিউ মিররে দেখলাম। সত্যি। ইরার মৃতদেহের ডান চোখটা সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। ভিতরে শুধু সাদা অংশ দেখা যাচ্ছে।

আমি কাঁধ ঝাঁকালাম।

“রিগর মর্টিস শুরু হয়নি এখনো পুরোপুরি। শরীর এখনো নরম। গাড়ির ঝাঁকুনিতে হয়তো চোখের পাতা সরে গেছে।”

ইরা কাঁপা গলায় বলল,

“দয়া করে… চোখটা বন্ধ করে দিন।”

“এখন না। আমি গাড়ি থামাব না।”

“কেন?”

“কারণ আমি দেখতে চাই তোমার দেহটা কখন পুরোপুরি ‘মৃত’ হয়ে যায়। আর তুমি কখন পুরোপুরি বুঝতে পারো যে তুমি আর ফিরে যেতে পারবে না।”

বৃষ্টি আরও জোরে পড়তে শুরু করল। রাস্তার দু’পাশের গাছগুলো ঝড়ের মতো দুলছিল।

ইরা আর কথা বলল না। শুধু চুপ করে বসে রইল। তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল, কিন্তু কোনো শব্দ হচ্ছিল না।

আমি স্পিড আরেকটু বাড়িয়ে দিলাম।

সামনে, অনেক দূরে, একটা ছোট গ্রামের আলো দেখা যাচ্ছিল। ইরার বাড়ির দিকে যাওয়া শেষ রাস্তা।

আমি ঠান্ডা গলায় বললাম,

“আর মাত্র চল্লিশ মিনিট।

তৈরি হয়ে নাও, ইরা।

তোমার পরিবার তোমাকে অপেক্ষা করছে।




ইরার মৃতদেহ কে গোসল করানোর জন্য একটা অংশ কাপড় দিয়ে ঘিরে আড়াল করা হয়েছিল। আমি গাড়ি নিয়ে সরাসরি ওদের বাড়ির উঠানে প্রবেশ করলাম। ততক্ষনে বৃষ্টি থেমে গিয়েছে। আমি নিজেই এরাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে, ওকে গোসল করানোর জন্য যে চৌকিটা রাখা হয়েছিল সেখানে শুয়ে দিলাম। ওই অংশটুকু চাদর দিয়ে পুরোপুরি ঘেরা। বাড়ির লোকজন বা আত্মীয়স্বজনরা তো আমাকে চেনে না। তারা কি কর্তব্যবিমূঢ় হয়ে রইলো। ইরার বাবা মা ভাই এসে এখনো পৌঁছায়নি। আমি আমার গাড়ির ভেতরে বসে আরেকটা সিগারেট ধরালাম। অ্যান্টিটাসিভ ও সিডেটিভের এর ডোজটা বেশ ভালই ধরেছে। সিটটা এলিয়ে দিয়ে মৃদু ভলিউমে মিউজিক বাজিয়ে দিয়ে সিগারেট টানতে থাকলাম। সবাই ঘটনার আকস্মিকতায় এতটাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গিয়েছিল যে কেউ আমাকে একটি প্রশ্নও করল না শুধু চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকলো।


এর আর বাবা মা ও ভাইয়ের আসতে এক-দেড় ঘণ্টা মতো দেরি হলো। উনারা তো আর আমার মত ওভার স্পিডিং করে আসেনি। কিন্তু যার পর নাই অবাক হলো ইরার লাশ আমি নিয়ে এসেছি দেখে। এই প্রথম তাদের সাথে আমার সামনাসামনি দেখা হলো। 


ইরার বাবা-মা আর ভাই যখন এসে পৌঁছাল, ততক্ষণে উঠানের পরিবেশটা অনেকটা স্থির হয়ে গিয়েছিল। শুধু মাঝে মাঝে কোনো মহিলার ফোঁপানির শব্দ ভেসে আসছিল। আমি গাড়ির ভিতরে বসে সিগারেট টানছিলাম। অ্যান্টিটাসিভ আর সিডেটিভের ঘোরটা এখন বেশ ভালোভাবেই ধরেছে। চোখের পাতা ভারী লাগছিল, কিন্তু ঘুম আসছিল না।

ইরার বাবা প্রথমে আমার গাড়ির দিকে এগিয়ে এলেন। চোখ লাল, মুখ ফ্যাকাশে। তিনি কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। আমি জানালা নামিয়ে দিয়ে শুধু একটা কথা বললাম,

“আপনার মেয়ে যেভাবে চেয়েছিল, সেভাবেই এনেছি। ফ্রিজিং গাড়িতে নয়।”

তিনি কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর শুধু মাথা নিচু করে চলে গেলেন। কোনো প্রশ্ন করলেন না। হয়তো করার মতো অবস্থায় ছিলেন না।

ইরা আমার পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার চোখে পানি, কিন্তু কোনো শব্দ হচ্ছিল না। আমি তাকে বললাম,

“আপনি চেয়েছিলেন লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়িতে শেষ যাত্রা না হোক। সেটা হয়নি। আশা করি আপনি খুশি হয়েছেন। আমি ফ্রিল্যান্সার। ক্লায়েন্ট স্যাটিসফ্যাকশন আমার কাছে টপ প্রায়োরিটি।”

ইরা কিছু বলল না। শুধু আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে কৃতজ্ঞতা আর এক ধরনের অসহায়ত্ব মিশে ছিল।

দাফনের আয়োজন শুরু হলো দ্রুত। গ্রামের মসজিদ থেকে লোকজন এসে গেল। ইরার দেহকে গোসল দেওয়া হয়ে গিয়েছিল। সাদা কাপড়ে জড়িয়ে রাখা হয়েছে। আমি জানাজায় অংশ নিলাম না। গাড়ির সিটটা পুরোপুরি এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলাম। মৃদু ভলিউমে একটা ইনস্ট্রুমেন্টাল ট্র্যাক বাজছিল। বাইরে লোকজনের কান্না, দোয়া, পায়ের শব্দ  সবকিছু যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসছিল।

আমার শরীর ক্লান্ত ছিল। সিডেটিভের প্রভাবে মাথাটা ঝিমঝিম করছিল। কেউ একজন এসে আমাকে বলল, “ভাই, আপনি অনেক ক্লান্ত। ভিতরে এসে একটু বিশ্রাম নিন।” আমি কোনো কথা না বলে উঠে পড়লাম। তারা আমাকে ইরার রুমে নিয়ে গেল।

রুমটা ছোট, সাদামাটা। একটা সিঙ্গেল খাট, একটা টেবিল, কয়েকটা বই, আর দেয়ালে ইরার কয়েকটা ছবি। আমি খাটের উপর শুয়ে পড়লাম। চোখ বন্ধ করতেই ঘুম নেমে এল। গভীর, অন্ধকার ঘুম।

যখন ঘুম ভাঙল, তখন বিকেল হয়ে গেছে। বাইরে আজানের শব্দ হচ্ছিল। ঘরের ভিতরে ইরা দাঁড়িয়ে ছিল। জানালা দিয়ে আসা নরম আলো তার শরীরের উপর পড়ছিল, কিন্তু ছায়া পড়ছিল না।

আমি উঠে বসলাম। মাথাটা এখনো ভারী।

“দাফন হয়ে গেছে?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

ইরা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। তার গলা খুব নরম।

“হ্যাঁ। সবাই চলে গেছে। শুধু আমার মা এখনো কাঁদছে।”

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। তারপর বললাম,

“আপনার কেমন লাগছে এখন?”

ইরা জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। অনেকক্ষণ পর বলল,

“আমি ভেবেছিলাম… যখন দাফন হয়ে যাবে, তখন হয়তো সব শেষ হয়ে যাবে। আমি চলে যাব। কিন্তু আমি এখনো এখানে আছি। আপনার পাশে। কেন?”

আমি সিগারেটের প্যাকেট বের করলাম। একটা ধরিয়ে বললাম,

“কারণ আপনি এখনো মায়াটা কাটাতে পারেননি। আপনি মরতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মৃত্যুকে পুরোপুরি মেনে নিতে পারেননি।”

ইরা আমার দিকে ফিরে তাকাল। তার চোখে এক ধরনের তীব্রতা।

“তাহলে আমি কী করব এখন?”

আমি ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললাম,

“যা খুশি। আপনি এখন মুক্ত। কোনো পরীক্ষক নেই, কোনো ফেল নেই, কোনো আইন নেই। শুধু আপনি আর আপনার চেতনা।”

ইরা খাটের কাছে এসে দাঁড়াল। তার গলায় একটা অদ্ভুত কাঁপুনি।

“আমি… আমার বাবা-মাকে দেখতে চাই। কিন্তু আমি তাদের সামনে যেতে পারছি না। তারা আমাকে দেখতে পাবে না। কিন্তু আমি তাদের দেখতে পাব। এটা… খুব কষ্টের।”

আমি উঠে দাঁড়ালাম। জানালার কাছে গিয়ে বাইরের উঠানের দিকে তাকালাম। সন্ধ্যার আলোয় ইরার বাড়িটা নিস্তব্ধ লাগছিল।

“তাহলে চলুন। আমি অপনাকে নিয়ে যাব। আপনি দেখবেন, আমি দেখব। কথা বলব না। শুধু দেখব।”

ইরা অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব আস্তে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।

আমি সিগারেটটা শেষ করে বললাম,

“চলুন। আপনার শেষ দেখাটা দেখে নিন। তারপর… তারপর আমরা দেখব কী করা যায়।”

বাইরে সূর্য ডুবে যাচ্ছিল। ইরার রুমের জানালা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস আসছিল। আমি দরজার দিকে এগোলাম। ইরা আমার পেছন পেছন এল।

দাফন হয়ে গিয়েছে।

কিন্তু ইরা এখনো যায়নি।

আর আমি… আমি এখনো কৌতূহলী।

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে গিয়েছিল। ইরার বাড়ির উঠান থেকে বেরিয়ে আমি ইরাকে শেষবারের মতো দেখলাম। সে দাঁড়িয়ে ছিল তার কবরের পাশে। চোখ দুটোতে এখনো পানি, কিন্তু কোনো কথা বলল না। আমিও কিছু বললাম না। শুধু মাথা নেড়ে জানিয়ে দিলাম যে আমি চলে যাচ্ছি।

যাওয়ার আগে একবার কবরস্থানে গেলাম। আপনাদের মনে আছে সেই ছেলেটার ফেলে যাওয়া একমুঠো ফুল রাস্তার মাঝখানে পড়ে ছিল। আমি সেটা কুড়িয়ে নিয়েছিলাম। ফুলগুলো অনেকটা শুকিয়ে গিয়েছিল, পাপড়ি কুঁচকে গেছে, কিন্তু এখনো সামান্য গন্ধ ছিল। আমি সেগুলো ইরার কবরের উপর রেখে দিলাম। তারপর আর কোনো দিকে না তাকিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লাম।

ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ওভার স্পিডিং করলাম না এবার। রাস্তা ফাঁকা, বৃষ্টি থেমে গেছে। শুধু হেডলাইটের আলো আর অন্ধকার মাঠের মাঝ দিয়ে গাড়ি চলছিল। আমার মনে কোনো আবেগ ছিল না। শুধু একটা কৌতূহল  ইরা এখন কী করবে? সে কি এখনো থেকে যাবে? নাকি চলে যাবে?

পূর্বাচলের ফ্ল্যাটে ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় দুটো বেজে গিয়েছিল। লিফটে উঠে, দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতেই দেখি  ইরা।

সে আমার কম্পিউটার চেয়ারে বসে আছে। ঠিক সেই প্রথম রাতের মতো। সাদা অ্যাপ্রনটা এখনো গায়ে। কিন্তু এবার তার চোখে অন্য একটা ভাব।

আমি দরজা বন্ধ করে জুতো খুললাম। কোনো অবাক হওয়ার ভাব দেখালাম না। শুধু বললাম,

“আপনি এখানে?”

ইরা উঠে দাঁড়াল। তার গলায় এক ধরনের অভিমান আর বিস্ময় মিশে ছিল।

“আপনি পেমেন্ট নেননি। কেন?”

আমি সোজা রান্নাঘরের দিকে গেলাম। এক গ্লাস পানি ঢেলে খেলাম। তারপর ফিরে এসে বললাম,

“কারণ আমার ইচ্ছা।”

ইরা এক পা এগিয়ে এল। তার চোখ সরু হয়ে গেল।

“আপনি তো বলেছিলেন  আপনি টাকা ছাড়া কোনো কাজ করেন না। চ্যারিটি চালান না। তাহলে?”

আমি খাটের উপর বসে পড়লাম। সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা ধরালাম। ধোঁয়াটা ধীরে ধীরে উঠে গেল কালো সিলিংয়ের দিকে। স্মেকিং ভেন্ট সেটা টেনে নিলো সাতে সাথেই।

“আমি কৌতূহলী হয়ে পড়েছিলাম। আপনার দেহটা নিয়ে যাওয়া, আপনার পরিবারের প্রতিক্রিয়া, আপনার আত্মা বলবোনা কারন বিষয়টা সেরকম কিছুনা আত্মা বলে কিছু নেই, হুমম চেতনা বলাযেতে পারে তো সেই চেতনার এখনো থেকে যাওয়া এসব দেখতে চেয়েছিলাম। টাকাটা সেই কৌতূহলের তুলনায় খুব ছোট হয়ে গিয়েছিল।”

ইরা অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল,

“আপনি সত্যি আবেগহীন। কিন্তু… আপনি আমার জন্য অনেক কিছু করেছেন। আমি জানি না কীভাবে ধন্যবাদ দেব।”

আমি ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললাম,

“ধন্যবাদ লাগবে না। আমি এখনো কৌতূহলী। আপনি এখন কী করবেন? আপনার কবরে শুয়ে থাকবেন? নাকি এখানে আমার সাথে থাকবেন? অথবা… চলে যাবেন যেখানে যাওয়ার কথা?”

“আমি জানি না। আমার মনে হয়… আমি এখনো মায়া কাটাতে পারছিনা পারছি না। আমার বাবা-মা, ভাই, সেই ছেলেটা… সবাইকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু আমি জানি, আমাকে যেতে হবে।”

আমি সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিলাম।

“তাহলে যান। কিন্তু যাওয়ার আগে একটা কথা বলে যান।

মৃত্যুর পরেও কেন আপনি এতটা ‘জীবিত’ লাগছেন? এই অনুভূতি কোথা থেকে আসছে?”

ইরা হালকা হাসল। খুব করুণ হাসি।

“হয়তো কারণ আমি মরতে চাইনি। আমি শুধু পালাতে চেয়েছিলাম। আর আপনি… আপনি আমাকে একটু সময় দিয়েছেন। একটু জায়গা দিয়েছেন শেষবারের মতো সবকিছু দেখে নেওয়ার।”

আমি কিছু বললাম না।

ইরা আমার কাছে এগিয়ে এল। তার চোখে এখন আর পানি নেই। শুধু একটা শান্ত, গভীর দৃষ্টি।

“এনাম সাহেব… আপনাকে একটা কথা বলে যাই।

আপনার এই কালো ঘর, এই অন্ধকার, এই নির্লিপ্ততা এগুলো আসলে আপনারও একটা পালানোর জায়গা। হয়তো একদিন আপনারও কেউ আসবে। হয়তো আপনিও কোনো একটা ‘কাজ’ করবেন শুধু কৌতূহল থেকে। আর সেদিন হয়তো বুঝতে পারবেন আবেগ না থাকাটাও এক ধরনের বোঝা।”

আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। কোনো উত্তর দিলাম না।

ইরা পিছিয়ে গেল। তার শরীরটা ধীরে ধীরে হালকা হয়ে যাচ্ছিল। যেন বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে।

“ধন্যবাদ… সবকিছুর জন্য।”

শেষ কথাটা বলে সে পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেল। রুমে শুধু আমি আর আমার কালো দেওয়ালগুলো রয়ে গেল।

আমি খাটে শুয়ে পড়লাম। চোখ বন্ধ করলাম।

কিন্তু ঘুম আসছিল না।

মাথার ভিতরে শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরছিল 

“আমি কি সত্যি আবেগহীন? নাকি শুধু নিজেকে সেটা বলে বোঝাই?”

বাইরে শীতলক্ষ্যার জল অন্ধকারে নীরবে বয়ে চলেছিল।

আর আমার ডার্ক রুমে আবার সেই অনন্ত সময়ের লুপ শুরু হয়ে গেল।


ইরা পুরোপুরি মিলিয়ে যাওয়ার কয়েক সেকেন্ড পরই আমার মোবাইলটা ভাইব্রেট করতে শুরু করল।

স্ক্রিনে নামটা জ্বলজ্বল করছে  ডা. নওরিন

আমি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে তাকিয়ে রইলাম। তারপর ধীরে ধীরে ফোনটা তুলে নিলাম। রিসিভ করার আগে একবার ঘড়ির দিকে তাকালাম। রাত ০৩:১৭।

“হ্যালো।”

আমার গলা সম্পূর্ণ সমতল, কোনো আগ্রহ বা বিরক্তি নেই।

ওপাশ থেকে নওরিনের গলা ভেসে এল। স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি উত্তেজিত, একটু বেশি দ্রুত।

“এনাম? তুমি কোথায়? আমি অনেকবার চেষ্টা করেছি। ফোন ধরোনি কেন?”

আমি খাটের উপর উঠে বসলাম। পিঠটা দেওয়ালে ঠেকিয়ে দিয়ে বললাম,

“কাজে ছিলাম। এখন ফিরেছি। কী হয়েছে?”

নওরিন একটু থামল। তারপর নিচু গলায় বলল,

“তুমি… ইরা নামের মেয়েটার কেসটা শুনেছ? রাজশাহী মেডিকেল কলেজের থার্ড ইয়ার। আত্মহত্যা করেছে।”

আমি চুপ করে রইলাম। কোনো উত্তর দিলাম না।

নওরিন আবার বলতে লাগল,

“আজ দুপুরে খবরটা ছড়িয়ে পড়েছে। রাজশাহীর ওই কেসটা নিয়ে সবাই আলোচনা করছে। পরিবার নাকি ময়নাতদন্ত করতে দেয়নি।

আমি সিগারেটের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলাম।

“তাতে আমার কী আর তোমরই বা কি?”

নওরিনের গলা আরও নিচু হয়ে গেল।

“এনাম…আমার ধারনা তুমি এর সাথে জড়িত। তুমি কেন এটা করলে?

“কৌতূহল।”

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর নওরিন হালকা হেসে উঠল। কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না।

“তোমার এই কৌতূহল একদিন তোমাকে বিপদে ফেলবে, এনাম।

আমি বললাম তুমি এটা নিয়ে এত ভাবছে কেন?

নওরিনের গলা এবার একটু কঠিন হয়ে গেল।

“কারণ আমি তোমাকে চিনি, এনাম। তুমি সাধারণত কোন বিষয়ে এতটা জড়িয়ে পড়ো না। কিন্তু এবার কিছু একটা আলাদা লাগছে। তুমি আমাকে বলবে না?”

আমি সিগারেটে লম্বা একটা টান দিলাম তারপর ছেড়ে দিলাম। স্মেকিং ভেন্ট দ্রুত ধোয়াটা টেনে নিলো।

“নওরিন, তুমি যদি সত্যি জানতে চাও, তাহলে একদিন এসো দেখা করি।

তখন বলব। হয়তো।”

ওপাশ থেকে নওরিনের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা গেল।

“ঠিক আছে। আমি আসব। কিন্তু এনাম… ভালো থেকো। নিজের খেয়াল রেখ।

ফোনটা কেটে গেল।

আমি মোবাইলটা খাটের উপর ছুড়ে দিয়ে আবার শুয়ে পড়লাম।

রুমের কালো দেওয়ালগুলো চারদিক থেকে আমাকে ঘিরে ধরেছে। কোথাও কোনো আলোর প্রতিফলন নেই। শুধু আমার সিগারেটের আগুনের ছোট্ট লাল বিন্দুটা জ্বলছে।

সিগারেটটা অ্যাস্ট্রেতে গুজে আমি চোখ বন্ধ করলাম।

কিন্তু ঘুম এল না।

শুধু অন্ধকারে একটা অদ্ভুত অনুভূতি জন্ম নিল 

যেন এই ব্যাপারটা এখনো শেষ হয়নি।

বরং এখন সবে শুরু হতে চলেছে…


(চলবে-)








একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ